আবুল খায়ের, কর্ণফুলী ও পিএইচপিকে কারণ দর্শানোর চিঠি

ওয়্যারহাউজে নন-বন্ডেড পণ্য সংরক্ষণের অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা বাতিল করতে চাইছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আবুল খায়ের, কর্ণফুলী স্টিলস ও পিএইচপির মতো স্বনামধন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানেরও নাম রয়েছে এ তালিকায়। বন্ড লাইসেন্স স্থগিত করার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে কেন তা বাতিল করা হবে না জানতে চেয়ে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী বরাবর চিঠিও পাঠিয়েছে এনবিআর। অন্যদিকে লাইসেন্স ভঙ্গের অভিযোগ উঠলেও এক্ষেত্রে এনবিআরের আইনেই ঘাটতি রয়েছে বলে পাল্টা অভিযোগ তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করে ওয়্যারহাউজে রেখে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের। শুধু বন্ডেড লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকেই এ সুবিধা দিচ্ছে এনবিআর। তবে এক্ষেত্রে শুধু অনুমোদনপ্রাপ্ত পণ্যের জন্য ওয়্যারহাউজ ব্যবহারের শর্ত রয়েছে।

এনবিআরের অভিযোগ, ওয়্যারহাউজে নন-বন্ডেড পণ্য সংরক্ষণ করে এ শর্ত ভঙ্গ করছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে নিবন্ধন নেয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে বন্ডেড পণ্য আমদানি না করেই এ সুবিধা ভোগেরও অভিযোগ তুলেছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি আবুল খায়ের লিমিটেড, আবুল খায়ের স্টিল প্রডাক্ট লিমিটেড, কর্ণফুলী স্টিলস, পিএইচপি নফ কন্টিনিউয়াস গ্যালভানাইজিং ও কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বন্ড লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করার পাশাপাশি তা স্থায়ীভাবে কেন বাতিল করা হবে না জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে এনবিআরের কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রাম। চিঠিতে কারণ দর্শানোর জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে ১৫ কার্যদিবস। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বন্ড কমিশনারেট।

চট্টগ্রাম বন্ড কমিশনারেটের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, কাস্টমস আইন-১৯৬৯-এর বিধিবিধান ও নিবন্ধন বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী, বন্ড নিবন্ধন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল বন্ড সুবিধার কাঁচামাল আমদানি ও তা ওয়্যারহাউজে সংরক্ষণ করবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বিশেষ প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কিছু পণ্য আমদানি করতে পারে। সেক্ষেত্রে একই আইনের ৮৭ ধারা অনুযায়ী তাদের আমদানির তথ্য এনবিআরের কাছে প্রতিবেদন আকারে দিতে হবে। তবে আইনের ৯৭ ধারায় বন্ডেড গুদামে শুল্ককর পরিশোধ করার পর তা সংরক্ষণ করার সুযোগ নেই। ফলে বন্ডের পণ্য ছাড়া ওয়্যারহাউজে অন্য পণ্য সংরক্ষণের সুযোগ নেই। এসব প্রতিষ্ঠান আইনের সবগুলো ধারাই লঙ্ঘন করেছে। ফলে তাদের বন্ড লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত করাসহ স্থায়ীভাবে কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

এনবিআরের দাবি, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আবুল খায়ের লিমিটেড বন্ডের শর্ত ভঙ্গ করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ৪২ হাজার ৫২০ টন কাঁচামাল আমদানি করেছে। কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ‘বন্ড লাইসেন্স নেয়ার পর আপনার প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভিত্তিতে পণ্য আমদানি করেছে। বন্ড লাইসেন্স শর্তাবলির ৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বন্ড ওয়্যারহাউজে কাঁচামাল সংরক্ষণ, উৎপাদন এলাকা, উৎপাদিত পণ্য ও উৎপাদিত প্যাকেজ লাইসেন্স কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করতে হবে। একই আইনের ৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এনবিআরের এসআরও মেনে চলতে হবে যেকোনো বন্ড লাইসেন্সধারীকে। আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, এনবিআরের অনুমতি ছাড়া ওয়্যারহাউজ ব্যবহারে কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এ অবস্থায় লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় কাস্টমস অ্যাক্ট-১৯৬৯-এর ৯ ধারা অনুযায়ী আবুল খায়ের লিমিটেডের বন্ড লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত ও বিন (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার) কেন লক করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনের ১৩(২) ধারা অনুযায়ী, বন্ড লাইসেন্স কেন স্থায়ীভাবে বাতিল করা হবে না ১৫ দিনের মধ্যে তার জবাব দিতে বলা হয়েছে’।

একই ধরনের চিঠি দিয়ে আবুল খায়ের স্টিল প্রডাক্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪৭ লাখ ১৯৫ টন, কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৪ লাখ ৩৬২ টন, পিএইচপি নফ কন্টিনিউয়াস গ্যালভানাইজিংয়ের বিরুদ্ধে ১০ হাজার ৪৬৩ টন ও কেওয়াইসিআর কয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে ২০ হাজার ৯৫ টন পণ্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আমদানি করে ওয়্যারহাউজে সংরক্ষণ ও ব্যবহারের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

বন্ড কমিশনারেট থেকে লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ করা হলেও এক্ষেত্রে এনবিআরের আইনেই ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবুল খায়ের গ্রুপের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, বন্ডেড ওয়্যারহাউজের লাইসেন্স নেয়ার পর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী কাঁচামাল আমদানি ও সংরক্ষণে বন্ড সুবিধা পাবে কোম্পানি। তবে অনেক পণ্যই বন্ড লাইসেন্সের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না। ফলে বাণিজ্যিকভিত্তিতে পণ্য আমদানি করতে হয়।

বাণিজ্যিকভিত্তিতে আমদানি ব্যবসায়ীদেরই ক্ষতি উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, আমদানির সময়ই শুল্ককর পরিশোধ করার কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোম্পানিগুলো। বন্ডের সুবিধা পেলে অন্তত ছয় মাস শুল্ক পরিশোধ ছাড়াই ওয়্যারহাউজে পণ্য সংরক্ষণ করা যেত। এনবিআরের আইনি জটিলতার কারণে পণ্য আমদানি করেও অতিরিক্ত শুল্কপ্রদান ও গুদামজাত করতে ঝামেলায় পড়তে হয়। এক্ষেত্রে অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণের সুযোগ দিলেই সমস্যাটি মিটে যায়।

সূত্র- বণিক বার্তা.নেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar