কভিড-১৯: বড় ভূমিকায় নেই এনজিওগুলো!

সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বেশকিছু দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। এসব দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও (এনজিও)। সচেতনতা তৈরি থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক ও নানা ধরনের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে এনজিওগুলো।

সর্বশেষ রোহিঙ্গা সংকটেও দেশী-বিদেশী এনজিওগুলো রেখেছে প্রশংসনীয় ভূমিকা। কিন্তু চলমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় এনজিওগুলোর উপস্থিতি সেভাবে চোখে পড়ছে না। দু-একটি বড় প্রতিষ্ঠান স্বল্প পরিসরে কিছু উদ্যোগ নিলেও সার্বিকভাবে করোনা সংকট মোকাবেলায় এনজিওগুলোর অবদান তেমন একটা দৃশ্যমান নেই।

বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ এরই মধ্যে দেশেও বড় ধরনের কিছু সংকট তৈরি করেছে। এটি মোকাবেলায় জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকেও কার্যকর ও শক্তিশালী করে তোলা জরুরি। এ ধরনের কাজগুলোয় বরাবরই এনজিওগুলো এগিয়ে এলেও করোনাজনিত সংকটে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা একেবারেই যৎসামান্য।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা  প্রতিষ্ঠানও  (আইইডিসিআর) করোনা মোকাবেলায় সচেতন জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে, বিশেষ করে গ্রামীণ জনগণের কাছে এ সচেতন জীবনযাপনের গুরুত্ব সেভাবে পৌঁছে না। এছাড়া কভিড-১৯ সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্বিপাকে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছানোও জরুরি। সামনের দিনগুলোয় সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি জরুরি সচেতনতা ও সহায়তা কার্যক্রম নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এনজিওগুলোকেও।

এ বিষয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এনজিও আশার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, করোনা পরিস্থিতি সামষ্টিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে। যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে কর্মীদের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে বিশেষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এনজিওগুলো সরকার ঘোষিত ঋণের কিস্তি মওকুফের সময় আরো বাড়িয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারে। পাশাপাশি এনজিওগুলোর সিএসআর ফান্ড রয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সীমিত আয়ের কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হবে। এনজিওগুলো সিএসআর ফান্ডের মাধ্যমে সীমিত আয়ের কিংবা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে বিকল্প কর্মসূচি চালু করতে পারে। করোনা-পরবর্তী সময়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানসম্পন্ন জীবিকা নির্বাহে এনজিওগুলোর এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের অবদান রেখেছে এনজিওগুলো। পাশাপাশি সময়োপযোগী সাড়া দিয়েছে রোহিঙ্গা সংকটের কালেও। উদ্বাস্তুদের খাদ্য, বাসস্থানসহ মৌলিক চাহিদা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এনজিওগুলো। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সেভাবে সাড়া মেলেনি এসব প্রতিষ্ঠানের।

দারিদ্র্য ও সচেতনতাহীনতার কারণে দেশের বস্তি এলাকার ভাসমান মানুষও এখন ঝুঁকিতে। তাদের কাছে পৌঁছে না যথেষ্ট পরিমাণ সুরক্ষা উপকরণ। সারা দেশের এনজিওগুলোর ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত গ্রাহক রয়েছেন প্রায় ৪২ লাখ। এর মধ্যে সরাসরি ঋণ নিয়েছেন প্রায় ৩৫ লাখ। তাদের নেয়া মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চলমান করোনা পরিস্থিতির বহুমুখী অভিঘাতে বিপন্ন তাদের জীবন-জীবিকা। এসব ক্ষেত্রে এনজিওগুলোর ব্যাপক কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মূলত কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণেই কভিড-১৯ ইস্যুতে স্থানীয় পর্যায়ে এনজিওগুলোর কার্যক্রম তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না বলে জানালেন যশোরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিও জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের (জেসিএফ) নির্বাহী পরিচালক আজাদুর রহমান আরজু।

তিনি বলেন, আমরা আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিতে প্রস্তুত রয়েছি। সরকার ঘোষিত ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রেখেছি। প্রশাসনে যতটুকু সম্ভব আর্থিক সহযোগিতা করেছি। শুধু অর্থ নয়, জনগণের সচেতনতা বাড়াতে কার্যক্রম নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেটি নিতে পারছি না আমার নিজের কর্মীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে। মাঠের অনেক কর্মী ছুটিতে থাকতে চাইছেন। তবে পর্যাপ্ত সুরক্ষা উপকরণ পেলে তাদের আরো কাজে লাগাতে পারব।

এনজিওগুলোর কার্যক্রম যে একেবারেই নেই, তা নয়। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ্ সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, কভিড-১৯-এর ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্র্যাক তার সামর্থ্যের সবটুকু সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য দুই লাখ মাস্ক তৈরি করছে। দেশেই পিপিই বা সুরক্ষা পোশাক তৈরির বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ব্র্যাকের ৫০ হাজারেরও বেশি মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী দেশের ৬১ জেলার তৃণমূল মানুষের কাছে কভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবেলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবার্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ পৌঁছে দেয়ার কাজ করে যাচ্ছে। ব্র্যাক তার ঋণ কর্মসূচির কিস্তি জমাদান ২৪ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রেখেছে। ডিজিটাল মাধ্যমেও ব্র্যাক তথ্যসেবা দিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar