চট্টগ্রামে অনেক ডাক্তারই ছুটিতে

চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের অধিকাংশ ডাক্তার এখন ছুটিতে। ফলে চিকিৎসা সেবা না পেয়ে চরম হতাশায় রোগী ও রোগীর স্বজনরা।

যারা আছেন তারাও মুখে বিশেষায়িত পোশাক, গাউন, মাস্ক ও মাথায় রোগ নিরোধক ক্যাপ পড়েছেন। যাদের অনেকের চেম্বারের সামনে ঝুলানো রয়েছে-জ্বর, সর্দি ও কাশিজনিত রোগীর চিকিৎসা এখানে দেয়া হয় না। অন্য রোগীদেরও শরীর স্পর্শ না করে শুধু মুখে কথা বলে রোগের অবস্থান বুঝে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন চিকিৎিসকরা। শুধু চিকিৎসক নয়, নগরীর বিভিন্ন রোগ নিরূপণী কেন্দ্রে রোগ নিরূপণ যন্ত্রের অপারেটর ও সহকারীরাও মাস্ক, গাউন ও মাথায় ক্যাপ পড়ে করোনোর সংক্রমণের ভয়ে দুরত্ব বজায় রেখে কাজ করছেন। তাদের অনেকে কোন রোগী আসলে জ্বর-সর্দি কাশি আছে কি না জানতে চেয়ে তাদের স্থান ত্যাগ করার জন্য বকাবকি করতেও দেখা গেছে।

শুক্রবার সকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর বেসরকারি এপিক হাসপাতাল এন্ড ডায়গনষ্টিক সেন্টার, পপুলার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতালও পার্কভিউ হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসকদের অধিকাংশই ছুটিতে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সকাল ৯ টায় হাসিনা আক্তার (৬৮) নামে এক রোগী ছেলেকে নিয়ে এপিক হাসপাতালে আল্টাসনোগ্রাফী করাতে যান। নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালের চিকিৎসক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিভার রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক মো. রফিক উদ্দিন আল্টাসনোগ্রাফী করার জন্য হাসিনা আক্তারকে এপিক হাসপাতালের লিভার রোগ নিরুপণের জন্য ডাক্তার মো. মাইনুদ্দি, দিদারুল আলম এবং পবিত্র কুন্ড এর কাছে পাঠান। কিন্তু তিন চিকিৎসকের একজনও নেই হাসপাতালে।

হাসপাতালের সহকারী রিজিয়া আক্তার জানান, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পর থেকে তিন জন স্যারই ছুটিতে চলে গেছেন। কখন যে তারা আসবেন তা জানার কোন সুযোগ নেই। তবে বর্তমানে নার্গিস ও নাজমা ম্যাডাম নামে দুই চিকিৎসক আছেন, চাইলে তাদের দিয়ে করাতে পারেন। এ কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসিনা আক্তার বলেন, ডাক্তার যাকে দিয়ে করাতে বলেছেন-তাকে দিয়ে না করালে তো হবে না। অগত্যা ছেলেকে নিয়ে ফিরে গেলেন তিনি।

একই অবস্থা নগরীর পাঁচলাইশ থানার পপুলার হাসপাতাল ও ডায়াগষ্টিক সেন্টারে। সেখানেও ডাক্তার ছুটিতে থাকায় কেউ চিকিৎসা না করিয়ে ফেরত যাচ্ছেন। আর কেউ নিরুপায় হয়ে উপস্থিত অন্য কোন ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাচ্ছেন।

নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে দেখা যায়, ডায়াবেটিস ও লিভার বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক মো. রফিক উদ্দিন চেম্বার করছেন বিশেষায়িত পোশাক, গাউন, মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ পড়ে। চেম্বারে প্রবেশের আগেই তিনি দরজায় টাঙিয়ে রেখেছেন- মুখে মাস্ক পড়া ছাড়া কোনো রোগী বা রোগীর স্বজন চেম্বারে প্রবেশ করা নিষেধ। এছাড়া জ্বর-সর্দি ও কাশিজনিত রোগীর কোনো চিকিৎসা এখানে দেয়া হয় না।

দেখা যায় তাঁর চেম্বারের পাশাপাশি আরও ৫ জন ডাক্তারের চেম্বার রয়েছে। কিন্তু সবকটি চেম্বারের দরজা বন্ধ। রোগী ডাক্তারদের খোঁজাজি করলেও হাসপাতালের ঝাড়ুদার, আয়া বা অন্য সহকারীরা বলছেন-ডাক্তার ছুটিতে। মার্চ মাসের পরে যোগাযোগ করবেন। এরমধ্যে ডাক্তারদের পাবেন না।

এই হলো নগরীর সবকটি বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের ছুটতিে থাকার গল্প। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল, শিশু ও মাতৃসদন ক্লিনিকগুলোতেও ডাক্তার শূণ্য।

তবে ভিন্ন চিত্র চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেলা হাসপাতালের। এসব হাসপাতালে খোলা হয়েছে করোনা আক্রান্তদের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ড। যেখানে সদা জাগ্রত কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। এসব ওয়ার্ডে যাতায়াত ও গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সেখানে কতজন চিকিৎসাধীন রয়েছে এ ব্যাপারে তেমন একটা মুখ খুলছেন না কেউ। তবে এসব ওয়ার্ডে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

এ বিষয়ে চিকিৎসকদের বক্তব্য, ডাক্তারদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পার্সোনাল প্রোটেকশন ইক্যুপমেন্ট-পিপিই) সংকট রয়েছে। এ অবস্থায় চিকিৎসকদের বিশেষ কিছু করার থাকছে না। তাদের নিজেদেরও স্বাস্থ্য চিন্তা করতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের পিপিইর সংস্থান করা বিশেষ জরুরি হয়ে উঠেছে।

চিকিসকদের ভাষ্য, দেশে করোনার রোগী শনাক্তের পর চারদিকে হুলস্থুল শুরু হয়। একজনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এই আতংক বেড়ে যায়। করোনা আতংক নিয়ে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, চিকিৎসকদের মাঝেও আতংক তৈরি হয়েছে। দুবাই ফেরত এক রোগীর চিকিৎসার পর এক মহিলা চিকিৎসক জ্বরসহ আনুষঙ্গিক উপসর্গের শিকার হওয়ার ঘটনায় অনেক ডাক্তার সর্দি কাশির রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন।

এদিকে গত বুধবার হাই-নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এক রোগী ভর্তি হন নগরীর একটি বেসরকারি ক্লিনিকে। ওই রোগীর অবস্থা শোচনীয় হলেও কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায়নি। রোগীর আত্নীয়-স্বজনদের পক্ষ থেকে একের পর এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে কল দেয়া হলেও কোন ডাক্তারই আসেননি। সকলেই জ্বর এবং সর্দি কাশিতে আক্রান্ত রোগী দেখার মতো অবস্থা নেই বলে জানান।

ওই রোগীর আত্নীয় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতা মাহফুজুল হক শাহ বলেন, এক অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কোন ডাক্তার রোগী দেখতে আসছেন না। অথচ ওই রোগীর পরিবারের কেউ বিদেশ থেকে ফিরেননি। ওনি নিজে বিদেশে যাননি। তিনি বাইরে কোথাও ঘোরাঘুরি করেননি।করোনায় আক্রান্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাও এই রোগির নেই। তিনি বহুদিন ধরে ঠান্ডাজনিত সমস্যায় ভুগছেন। বর্তমানে নিউমোনিয়া বেড়েছে। অথচ উনাকে কোন ডাক্তার দেখাতে পারছি না। চট্টগ্রামে করোনা পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা না থাকায় এই রোগি যে সাধারণ রোগী তাও কাউকে বুঝানো যাচ্ছে না। এটি সাংঘাতিক একটি পরিস্থিতি।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বি এ বিষয়ে বলেন, করোনা পজেটিভ শনাক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত কোন রোগীকে চিকিৎসা না দেয়ার কোন সুযোগ নেই। যে কোন রোগী নিকটস্থ যেই হাসপাতালে যাবেন সেখানেই তাকে চিকিৎসা দিতে হবে তিনি বলেন, এ সময় এমনিতেই সাধারণ ফ্লু দেখা দেয়। এতে সাধারণভাবেই বহু মানুষ সর্দি কাশি এবং জ্বরে আক্রান্ত হয়। কেউ কেউ আক্রান্ত হয় নিউমোনিয়ায়। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে এসব রোগের চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে না, সেটা জেনেছি আমরা। মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar