চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার

চট্টগ্রামে মাত্রাতিরিক্ত বন্দী, নানা সমস্যা

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার ও কক্সবাজার জেলা কারাগারে ‘মাত্রাতিরিক্ত বন্দী’ নিয়ে চিন্তিত কারা কর্তৃপক্ষ। ধারণ ক্ষমতার ৫ গুণের বেশি বন্দী থাকার কারণে মাদকাসক্ত, বয়স্ক বন্দী ও চিহ্নিত জঙ্গিদের আলাদা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের (জেলা প্রশাসক) কাছে কারা মহাপরিদর্শকের পাঠানো এক প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৬ ডিসেম্বর কারা মহাপরিদর্শকের পক্ষে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ ইকবাল হাসান স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনটি চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৯ হাজার ৫৯২ জন। কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ৩ হাজার ৯৭৫ জন। অথচ চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দীর ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে ১ হাজার ৮৫৩। কক্সবাজার জেলা কারাগারের ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে ৫৩০ জন। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দীর সংখ্যা হচ্ছে ১০ হাজার ৩০০ জন। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৭৯ জন। নির্বাচনকে ঘিরে এ সংখ্যা আরো বাড়লে সমস্যা প্রকট হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও গত বছরের শেষ পর্যন্ত এই কারাগারে প্রায় পাঁচ হাজারের মতো বন্দী থাকত। কিন্তু চলতি বছরের শুরু থেকেই বন্দীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত ২০ ডিসেম্বর এসে বন্দীর সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়ায়।

আদালতের আদেশে প্রতিদিন বন্দী মুক্তি পেলেও আবার নতুন করে অনেক আসামি কারাগারে ঢুকছে। কিন্তু মুক্তির তুলনায় আটকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বন্দীদের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। জেলার ৩২টি থানায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে যেসব আসামি গ্রেপ্তার করে তাদের সবাইকে আদালতের নির্দেশে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

অতিরিক্ত বন্দী রাখতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। বন্দীরা ওয়ার্ডের কক্ষগুলোতে স্থান না পেয়ে ভবনের বারান্দায় স্থান নিয়েছে। কিন্তু পৌষের তীব্র শীতে তারা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে হাজিরার প্রয়োজনে আসা বন্দীরা কারাগারে নিজেদের চরম কষ্টের কথা জানান। বন্দীর সংখ্যার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মনির হোসেন জানান, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ১০ হাজার ৩০০ জন। কারাগারের ধারণ ক্ষমতা ১ হাজার ৮৫৩ জন।

কারা মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধারণ ক্ষমতার তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত বন্দী আটক থাকায় বন্দীদের আবাসন সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। অপরাধীর ধরন অনুযায়ী বন্দীদের আলাদা করে রাখার নিয়ম থাকলেও আবাসন সমস্যার কারণে মাদকাসক্ত, বয়স্ক বন্দী ও চিহ্নিত জঙ্গি বন্দীদের আলাদা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কারাগারের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া বন্দীদের সাথে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতে সমস্যাসহ নানারকম সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে। এই সুযোগে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সৃষ্টি হচ্ছে। যা রোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম আদালতে মামলায় হাজিরা দিতে আনা কয়েকজন আসামি জানান, ধারণ ক্ষমতার তুলনায় বেশি বন্দি থাকার ফলে বন্দীরা ন্যূনতম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
জানা গেছে, এ শীতের মধ্যে প্রতি বন্দীর সম্বল হচ্ছে একটি কম্বল। এ কম্বল ফ্লোরে বিছানোর পর গায়ে দেওয়ার মতো আর কিছু থাকে না। ফলে নিজের শরীরে যে শার্ট আছে, তা দিয়ে কোনোভাবে রাত পার করে বন্দীরা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিয়ম অনুযায়ী একজন বন্দী তিনটি কম্বল পায়। কিন্তু এই শীত মৌসুমে বন্দীর সংখ্যা আকস্মিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কারাগারে যে পরিমাণ কম্বল আছে, তা সব বন্দীকে দিতে হয়েছে।

জানা গেছে, জজ আদালতগুলোতে ছুটি চলার কারণে আসামিদের জামিনের বিষয়টি প্রলম্বিত হচ্ছে। ছুটি শেষে জজ আদালতগুলো সচল হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।

প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম কারাগার গড়ে উঠে ১৪ দশমিক ০০৬ একর জায়গার ওপর। এর মধ্যে কারাগারের ভেতরে রয়েছে ৮ দশমিক ৪৭ একর এবং বাইরে রয়েছে ৫ দশমিক ৫৩৬ একর জায়গা। একইভাবে কঙবাজার জেলা কারাগার গড়ে তোলা হয় ১২ দশমিক ৮৬ একর জায়গার ওপর। এর মধ্যে ভেতরে রয়েছে ৮ দশমিক ০৯ একর এবং বাইরে ৪ দশমিক ৭৭ একর জায়গা। এ পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম ও কঙবাজারে আরো একটি করে নতুন কারাগার নির্মাণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। সূত্র- আজাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar