চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ চোর চক্রের ১১ সদস্য গ্রেপ্তার

ওরা ১১ জন। সংঘবদ্ধ তালা কাটা অথবা দোকানের শার্টার কৌশলে ফাঁকা করে দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি ও লুট করাই তাদের পেশা। এই সিন্ডিকেট সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় বিশেষ সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে কথা বলেন। সাংকেতিক সেই ভাষায় পুলিশকে তারা তেলাচোরা বা তেইল্লাচোরা বলে ডাকে।

সাংকেতিক ভাষায় তারা দোকানকে বলে অফিস, তালাকে বলে আম, কার্টারকে বলে গাড়ী, চাদরকে বলে ঠোঙ্গা, দোকানের ভিতর চুরি করার জন্য যে প্রবেশ করে তাকে বলে অফিসম্যান, সংবাদদাতাকে ডাকে লাইনম্যান, চুরি করাকে বলে ডিউটি, চুরির টাকা পয়সাকে বলে ব্যবসা, চুরি করা টাকা ভাগ বাটোয়ারার সময় ১ লক্ষ টাকাকে বলে ১ টাকা।

এই সংঘবদ্ধ চোর চক্রের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানা পুলিশ। রোববার দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সংঘবদ্ধ চোর চক্রকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত জানায় পুলিশ। নগর পুলিশের ডিসি (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠ করেন। চোরচক্রের গ্রেপ্তার সদস্যরা হলেন দলনেতা হানিফ ওরফে হাতপোড়া হানিফ (৩৮), সেকেন্ড ইন কমান্ড কামাল (২৮), মো. লিয়াকত হোসেন (২৪), মো. তৌফিক (২৬), মো. মাসুম (২৬), নয়ন মল্লিক (২২), মো. মিলন (২৫), মো. কামাল হোসেন (২৮), জামাল উদ্দিন (৩০), মো. কামাল ওরফে ভুসি কামাল (৩২), মো. মিজান (২৫)।

এদের দলনেতা হাতপোড়া হানিফ। সে দেশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার বিভিন্ন শোরুম, বড় কাপড়ের দোকান, বড় মুদির দোকান, সিগারেট বা বিভিন্ন ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস, বিকাশের দোকানসহ যেসব দোকানে বেশি টাকা লেনদেন হয় অথবা রাতের বেলায় ক্যাশে বেশি টাকা থাকে এমন সব দোকান খুঁজে বের করে। দিনের বেলা মার্কেটে ঘুরে ঘুরে টার্গেট করে রাতের আঁধারে কৌশলে চুরি করে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরো জানানো হয়, এই সংঘবদ্ধ চোর চক্রটি দীর্ঘদিন নগরীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কৌশলে চুরি করে আসছিল। এদের মধ্যে দলনেতা হানিফের একহাত অকেজো। সেজন্য মানুষ তাকে সন্দেহের বাইরে রাখে। কোনো দোকান টার্গেট করার পর সর্বপ্রথম সে কামালকে সংবাদ দেয়। কামাল টার্গেট করা দোকানে চুরির আগে দোকানে কী পরিমাণ টাকা থাকবে, তা কীভাবে চুরি করবে, চুরির পর দ্রুত সে জায়গা হতে সরে যাওয়া সম্ভব কি না, চুরিতে কেমন জনবল লাগবে, কী ধরনের যন্ত্রপাতি লাগবে ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করেন।

চুরির বিষয়ে কামাল গ্রিন সিগন্যাল দিলে হানিফ নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্যকে মোবাইল ফোনে খবর দেন। দোকানের শার্টারের প্রস্থ ছোট হলে শার্টারে লাগানো তালা কাটেন, প্রস্থ বড় হলে শার্টারের দু’পাশ টেনে ফাঁকা করে দোকানে ঢোকেন। চুরির সময় দারোয়ান বা অন্য লোকজনের দৃষ্টি এড়াতে পর্দা, লুঙ্গি, বিছানার চাদর বা ছাতা ব্যবহার করেন। চুরির সময় দোকোনের মধ্যে এক থেকে দুই জন লোক ঢোকেন। দু’তিন মিনিটের মধ্যে দোকানে ঢুকে স্ক্রু ড্রাইভার বা ছোট কাটারির মাধ্যমে কৌশলে ক্যাশবাক্স, লকার ইত্যাদি ভেঙ্গে ফেলেন ওই ব্যক্তি। পরে সেখানে থাকা বহনযোগ্য মূল্যবান জিনিসপত্র, মোবাইল ফোনসেট, ল্যাপটপ ও টাকা চুরি করে বের হয়ে যান।

চক্রটি প্রায় ১০/১২ বছর ধরে দোকানের শার্টার ভেঙ্গে বা কৌশলে দোকানে ঢুকে চুরির কথা স্বীকার করেছে পুলিশের কাছে।

যেভাবে গ্রেপ্তার হলো

গত ২৭ জুন সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে নগরীর কোতোয়ালী থানার নন্দন কানন গোলাপ সিংহ লেইনে নিউ লাকি ইলেকট্রিক কোম্পানির দোকানের শার্টার কৌশলে ফাঁকা করে ভেতরে প্রবেশ করে চোরেরা। ক্যাশ বাক্সের তালা ভেঙে নগদ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। এর আগে গত ২০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে জুবিলী রোডে রয়েল প্লাজার তৃতীয় তলায় কাজী কম্পিউটারস-এর শার্টারের তালা কেটে ১২টি ল্যাপটপ, ৫২৫ পিস পেনড্রাইভ, ৪৫০ পিস মেমোরি কার্ডসহ প্রায় ১২ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে যায় । এই দু’টি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে শনিবার রাতে চক্রটির অবস্থান চিহ্নিত করতে সক্ষম হয় কোতোয়ালী থানা পুলিশ।

পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে, সংঘবদ্ধ চক্রটি আরেকটি চুরির প্রস্ততি নিচ্ছে। তারা ঘর ভাঙার সরঞ্জাম ও অস্ত্রশস্ত্রসহ লালদিঘীর পাড় জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় হোটেল তুনাজ্জিন আবাসিকের ১০৯ নম্বর রুমে অবস্থান করছে। খবর পেয়ে কোতোয়ালী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ গভীর রাতে অভিযান চালিয়ে ওদের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ২টি এলজি, ১টি লোহা কাটার, ১টি লোহার রড, ৪টি কার্তুজ ও চুরিতে ব্যবহৃত নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানায় পুলিশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar