জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করে ঋণ নিতে গিয়ে আটক

এক হিন্দু ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় পত্র জালিয়াতি করে ব্যাংক ঋণের চেষ্টা করেছিল একটি চক্র। এ জন্য তারা কৌশলে নির্বাচন কমিশন থেকে জাতীয় পরিচয় পত্র তুলে নিয়েছিল। চক্রটি একটি ভুয়া কোম্পানির নাম দিয়ে অন্য ব্যক্তিকে সেই হিন্দু ব্যক্তি সাজিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা ঋণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সেই জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে ঋণ নিতে গিয়েই বিপত্তিটা বাধে।

জাতীয় পরিচয় পত্রের সূত্র ধরে ব্যাংকের কর্মকর্তারা মাঠে নামলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসে। ধরা পড়ে যান নকল ব্যক্তি। এবার সেই নকল ব্যক্তির তথ্য ধরে বেরিয়ে আসে পরিচয় পত্র জালিয়াতি করা প্রতারণার গল্প। পরে ব্যাংকের কর্মকর্তারা গােয়েন্দাদের বিষয়টি অবহিত করলে তদন্ত করে আসল হোতাদের শনাক্ত করা হয়।

সম্প্রতি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কালীচরণ নামের এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণের নাম করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল চক্রটি। তবে বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এর মধ্যে দুজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

গােয়েন্দারা জানান, গাজীপুরে কালীচরণ নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন; যার জমিজমা কালিয়াকৈর থেকে শুরু করে গাজীপুর সদর পর্যন্ত রয়েছে। তিনি বয়স্ক হওয়ার কারণে তার পরিত্যক্ত জমিগুলোর খোঁজখবর নিতে পারতেন না। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে তারই গ্রামের আশপাশের কয়েকজন ব্যক্তি তার জাতীয় পরিচয় পত্র তুলে ভূমি অফিস থেকে তার নামে থাকা জমির দলিল তোলেন। পরে সেই দলিল দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ফন্দি করেন তারা।

তারই অংশ হিসেবে আরেকজন ব্যক্তিকে তারা কালীচরণ সাজান। সেই ব্যক্তিকে তারা এক লাখ টাকা দেবে বলে প্রলোভন দেখায়। এতে ওই ব্যক্তিও রাজি হন। তিনিও তার ছবি, স্বাক্ষর দেন। এরপর তারা সেই দলিল, ছবি, স্বাক্ষর ও জাতীয় পরিচয় পত্র নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকে যান। সেখানে গিয়ে তারা ইউএস ঢাকা কোম্পানির কর্মকর্তা বলে নিজেদের পরিচয় দেন। কোম্পানির জন্য তারা শত কোটি টাকা ঋণ চান।

গােয়েন্দারা আরও জানান, ব্যাংকে গিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যরা একেকজন নিজেকে সেই কোম্পানির পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলে পরিচয় দেন। ব্যাংকের কর্মকর্তারাও খুশিতে গদগদ। এত বড় কোম্পানির লোকজন তাদের কাছে ঋণের জন্য এসেছেন। এবার তারা তাদের কাছে কাগজপত্র চান। তারা সেই কাগজপত্র, জাতীয় পরিচয় পত্র ও নকল কালীচরণের ছবি দেন।

সেই জাতীয় পরিচয় পত্র যাচাই করতে গিয়ে ব্যাংকের কর্মকর্তারা দেখতে পান এটা আসল কালীচরণ নন। জাতীয় পরিচয় পত্র একজনের আর ছবি আরেকজনের। বিষয়টি জোরালোভাবে সন্দেহের তালিকায় রেখে ব্যাংকের কর্মকর্তারা ডিবিকে খবর দেন। পরে তদন্ত করতে গিয়েই বেরিয়ে আসে প্রতারণার আসল গল্প।

ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, ‘চক্রটি খুব চালাক। তাদের মধ্যে একজন কাসেম। যিনি নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তার বাবা খুব বৃদ্ধ এবং তার চিকিৎসার জন্য ব্যাংক ঋণ নিতে হবে জানিয়ে টাকার বিনিময়ে আসল কালীচরণের জাতীয় পরিচয় পত্র তুলে আনেন।

তারা যাকে নকল কালীচরণ বানিয়েছেন তাকে বলেছিলেন, আপনি একটু কষ্ট করে আপনার কয়েক কপি ছবি, সিলসহ স্বাক্ষর দেবেন। এর বিনিময়ে আমরা আপনাকে এক লাখ টাকা দেবো। যাকে নকল কালীচরণ বানানো হয়েছিল তিনি প্রায় ৮০ বছরের বৃদ্ধ। এরপর তারা কয়েকজন ইউএস ঢাকা নামে একটি কোম্পানি খোলেন, যার অফিসের কােনাে ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে তারা প্রতারণার জন্য ব্র্যাংক ঋণ নেওয়ারও চেষ্টা চালিয়েছিলেন।’

‘কিন্তু বিষয়টি নকল কালীচরণের ঠিকানায় যাচাই করতে গিয়ে বুঝতে পেরেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা দেখতে পান নকল ব্যক্তির ছবি মিলছে কিন্তু জাতীয় পরিচয় পত্রে থাকা ঠিকানা কোনোভাবেই মিলছে না। এবার তাদের খটকা বাধে। তারা দ্রুত আমাদের বিষয়টি জানালে আমরা মাঠে নেমে তদন্ত করতে গিয়ে দেখি এই কালীচরণ হচ্ছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কয়েক বছর আগে মারা যাওয়া এক ব্যক্তি, যার অঢেল সম্পত্তি রয়েছে। কিন্তু তিনি বৃদ্ধ হওয়ার পর থেকে সেগুলোর আর খোঁজখবর নিতে পারেননি। এমনকি তার ছেলেও জানতেন না তার বাবার কতগুলো জমি পড়ে আছে। এবার তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চালাই। কিন্তু তারা খুব চালাক। তাদের আটকের আগে তারা তিন দিন সময় দিয়েছিল কিন্তু তাদের পাওয়া যায়নি।’

চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন জনের জাতীয় পরিচয় পত্র জালিয়াতি করে এবং অন্যের দলিল তুলে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।

গত ১৭ অক্টোবর দুপুরে রাজধানীর বেইলি রােডের নাভানা স্টার কমপ্লেক্সের গ্রাউন্ড থেকে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন—আবুল কালাম (৩৫) ও জমির উদ্দিন (৫৮)। এখনো পলাতক আছেন প্রতারক চক্রের সদস্য মোশারফ হোসেন (৪০), অধিক চান বর্মণ (৭৮), মনজুর আহমেদ (৪০) ও মনির (৩৫)। পরে এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিমের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আখতারুজ্জামান বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি মামলা করেন। সেই মামলায় আসল কালীচরণের ছেলেকে সাক্ষী করা হয়েছে।

মামলার বাদী মোহাম্মদ আকতারুজ্জামান জানান, আটককৃত দুজনসহ সাত জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামি করে রমনা থানায় মামলা করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। সাক্ষী করা হয়েছে আসল কালীচরণের ছেলেকে।

খবর- প্রিয়.কম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar