জুয়া থেকে হুইপ সামশুলের আয় ১৮০ কোটি, দাবি পুলিশ পরিদর্শকের

চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের জুয়ার আসর থেকে গত পাঁচ বছরে ক্লাবটির মহাসচিব ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ১৮০ কোটি টাকা আয় করেছেন বলে পুলিশের একজন পরিদর্শক দাবি করেছেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১টা ৫৭ মিনিটে নিজের ফেইসবুক ওয়ালে এ সংক্রান্ত ‘ক্লাব-জুয়া-সাংসদ এবং ওসি’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেন পুলিশের পরিদর্শক সাইফ আমিন। তিনি এক সময় হালিশহর থানার সেকেন্ড অফিসার, চট্টগ্রাম মহানগর আদালতের হাজতখানার ইনচার্জসহ বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় কর্মরত।

ওই পোস্টে পরিদর্শক সাইফ আমিন লিখেন, ‘ক্যাসিনো, ফ্লাশ, হাউজি, হাজারি, কাইট, পয়শা (চাঁন তারা) এগুলো আবহমান কাল থেকেই মহানগর ও জেলা সদরের ওসিদের বিনা ঝামেলায় মোটা টাকা পাওয়ার পথ। মহানগরের ফ্ল্যাটকেন্দ্রিক দেহব্যবসা, ম্যাসাজ পার্লারগুলো ওসি সাহেবদের ২য় ইনকাম জেনারেটিং এসিসট্যান্স করে, থানার ক্যাশিয়ার কালেকশন করে ওসির প্রতিনিধি হিসেবে। ক্লাবপাড়ার ওসিরা এই দুই খাত থেকেই দৈনিক ৫ লাখ করে নিলেও মাসে সেটা দেড় কোটিতে পৌঁছায়। এবার আছে থানার সিভিল টিম, সিয়েরা ডে/নাইট, লিমা ডে/নাইট/ গল্ফ ডে নাইট।’

তিনি আরও লিখেন ‘এরপর ডিবি। ডিবি কালেকটিভ নেয় না, লিস্ট অনুযায়ী ইন্ডিভিজুয়াল কালেকশন। প্রতি মাসেই স্ব স্ব ইউনিট থেকে কর্মরত অফিসারদের তালিকা আপডেট করে হাউজগুলোতে পাঠানো হয়। বাকি থাকে মাদক, ওসিরা এখন মাদকের টাকা নেয় না। মফস্বলের ওসিরা চায় সারাবছর মেলা। মেলা মানে ধামাকা ধামাকা নৃত্য, জুয়া, হাউজি, ওয়ান/টেন আর ডাব্বা খেলা। দৈনিক ওসির ৫০ হাজার, মাসান্তে ১৫ লক্ষ, তিন মাস চললে ৪৫। ব্যস! আগের পোস্টিং ফ্রি, আর পরেরটা মজুদ। বাকি দিনে যা পান সব বোনাস।’

‘ঢাকায় মেনন সাহেব একটির চেয়ার অলঙ্কৃত করেছেন। দোষের কিছু নাই। রাজনীতি বলে নকশালীরা টাকশালি। অর্থাৎ টাকশালের মালিক তারা হন। চট্টগ্রামে শামসুল হক মাস্টার (!)। ছিঃ ধিক্কার জানাই। আমার নিজের হিসেবে তিনি আজ ৫ বছর চট্টগ্রাম আবাহনীর জুয়ার বোর্ডের মালিক, তত্তাবধায়ক এবং গডফাদার। দৈনিক সর্বনিম্ন ১০ লাখ করে নিলেও আজ ৫ বছরে শুধু জুয়া থেকে নিয়েছেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। ক্লাবটি হালিশহর থানায়, এমপি সাহেব ওসির জন্য মাসে হাজার দশেক টাকা পাঠান ছিঁচকে ছিনতাইকারী ও মাদকসেবী দীঘলের মারফত (তথাকথিত যুবলীগ নেতা)। টাকার এত অবনমনে হালিশহরের ওসিরা সেই টাকা নেন না। যদিও ঐ থানায় ১৩০০ টি দেহ ব্যবসালয় আছে। ওসি দৈনিক বাসা প্রতি ৫০০ টাকা করে ৬০ হাজার পান। মাসে এখাতে ১৮ লাখ পান, তাই মাস্টারের জুয়ার আখড়া মুফতে চললেও রা করেন না।’ লিখেছেন পরিদর্শক সাইফ আমিন।

‘এই হক মাস্টারের অর্থশালী হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করার অন্য কারবার হলো ইয়াবা ট্রানজিট। সরকারের কড়াকড়ি আরোপের আগ পর্যন্ত টেকনাফ থেকে আসা ইয়াবার ৮০ ভাগ তার পটিয়ায় ট্রানজিট নিতো। এবং র‍্যাব এর এনকাউন্টারে মাস্টার সাবের ইয়াবা উইং কমান্ডার নিহত হলে দীর্ঘ একযুগ পর চট্টগ্রামের স্টেশন কলোনি ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। শত অভিযান আর আন্তরিকতা সত্ত্বেও যা বন্ধ করতে পারেননি সিএমপির সাবেক কমিশনার জনাব মোহাঃ সফিকুল ইসলাম, জনাব জলিল, জনাব ইকবাল বাহার চৌঃ। অথচ হক মাস্টার ধোঁয়া তুলশী রয়ে গেলেন।’

পরিদর্শক সাইফ আমিন শেষে লিখেছেন, ‘জুয়া দিয়ে এবং নিয়ে দেশময় প্রায় একই অবস্থা। আগের সরকারে করেছেন খোকা, আব্বাস, ফালু এখন করছেন মেনন, শামসু মাস্টার, খালিদ। কিন্তু সব আমলেই কমন আছেন ব্রাত্য ওসি সাহেব।’

রোববার রাত সোয়া ১০টা পর্যন্ত পরিদর্শক সাইফ আমিনের উক্ত ফেসবুক স্ট্যাটাসে ৩১৩টি প্রতিক্রিয়া, ১৩৩টি কমেন্ট ও ৩০টি শেয়ার হয়েছে।

ফেসবুকের এ স্ট্যাটাসের নিচে ফারহান গফুর নামে একজন লিখেছেন, ‘স্যার, চাকরি থাকবে তো?’ এসআই সাইফ জবাব দেন, ‘১৯ বছর ধরেই যাচ্ছে। আরো একবার না হয়..।’

মইন খান নামের এক পুলিশ সদস্য লিখেছেন, ‘ওসি পর্যন্ত থামলেন কেন?? ওসি তো কমিশন অফিসার অন্য কথায় ডাক বাক্স। উপরের দিকে পোস্টিং সেলামী/মানথলী আরও কত কী পাঠাতে হয় বেচারাকে।’ এসআই সাইফ আমিন উত্তর দেন, ‘এজন্য ওসিরাই দায়ী। এই অশুভ বাণিজ্য তারাই শুরু করেছে। স্যার ১৯ বছরে একজন এসপি/এডি পাইনি খুঁজে টাকা নিয়েছেন। আমরাই দেয়ার জন্য পিছনের ঝিপার সহ খুলে দিই।’

মাহমুদ আব্বাস নামের একজন কমেন্ট করেছেন, ‘স্যার অপ্রিয় সত্যি কথা বলে দিলেন। সত্যি কথা বলার মত সৎ সাহসের লোকের বড়ই অভাব। প্রভুকে সন্তুষ্টকরণই নাকি ফেরেশতার কাজ। তাই ইনচার্জরা এরকম কালেকশন করেন নাকি! অনুমতি দিলে লেখাটি শেয়ার করব।’

মাহমুদ আব্বাসের প্রতি পরিদর্শক সাইফ আমিন লিখেছেন, ‘অবশ্যই। শেয়ার করো। আমি যা বলেছি দায়িত্ব নিয়েই বলেছি।’

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে রোববার রাতে জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের মহাসচিব সামশুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি এসব অভিযোগের বিষয়ে জানি না। আমার এখানে কোটি টাকার জুয়ার ব্যবসা হলে সারাদিন অভিযান করে কিছু পেল না কেন? আমি তো জুয়া খেলার জন্য ক্লাব করিনি। ক্লাবের মধ্যে আমার মেম্বাররা কার্ড খেলে- এটা ঠিক আছে। সেখানে ক্যাসিনো ব্যবসা আছে নাকি? এখন কে কী বললো না বললো এসবে আমার কিছু যায় আসে না। আবাহনী ক্লাবে মেম্বার ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারে না। মেম্বারদের জন্য কার্ড আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar