পাপিয়ার অস্ত্র ১২ রুশ তরুণী

জিম্মি করে ভিআইপিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন নরসিংদীর যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ। এজন্য তিনি ১২ জন রাশিয়ান তরুণীকে ব্যবহার করতেন। রিমান্ডে নেয়ার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া এ তথ্য জানান।

বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করে ভিআইপিদের ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডের’ ভিডিওচিত্র করে রাখা হতো। এরপর ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতেন পাপিয়া। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এমন খবর প্রকাশ করেছে দেশ রূপান্তর।

কর্মকর্তারা জানান, এসব কাজে পাপিয়াকে সহায়তা করতেন স্বামী সুমন চৌধুরী। বিমানবন্দর থানায় ২৫ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পাপিয়া-সুমনকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় অনেক ভিআইপির নাম বলেন এই দম্পতি। এমন সব তথ্য পেয়ে বিব্রত হচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

এদিকে পাপিয়া-সুমনকে নিজে হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে র‌্যাব। দুয়েক দিনের মধ্যেই র‌্যাব তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘থাইল্যান্ডের ব্যাংককে একাধিক ব্যাংকে পাপিয়ার অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে ওইসব অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে তা এখনো জানা যায়নি। পাপিয়া ও তার স্বামী বিদেশে টাকা পাচার করার কথা স্বীকার করেছে। তাছাড়া বাংলাদেশেও তার বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে।’

র‌্যাবের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘সুমন চৌধুরী অস্ত্র বিক্রির সঙ্গেও জড়িত। সিলেটের কানাইঘাট সীমান্তে তাদের একাধিক চক্র আছে। এছাড়া পাপিয়া ইয়াবার চালান নিয়ে আসার কথাও স্বীকার করেছেন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পাপিয়া আসলেই হাইপ্রোফাইল। নামিদামি এমন কোনো লোক নেই যার সঙ্গে তার পরিচয় নেই। জিজ্ঞাসাবাদে তারা যাদের নাম বলছে সবাই সমাজের নামিদামি ব্যক্তি। এসব তথ্য পেয়ে আসলে আমরা বিব্রত।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশের উত্তরা ডিভিশনের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণ চুপ থাকেন পাপিয়া। অবশ্য কিছুক্ষণ পরই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেন। প্রতারণা কাজে মূলত তরুণীদের ব্যবহার করতেন পাপিয়া। মাসখানেক আগে রাশিয়ার ১২ তরুণীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এই তরুণীদের আনতে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও সহায়তা করেছেন বলে তিনি আমাদের জানান। পাপিয়ার অপরাধ জগতের সঙ্গে আর কারা কারা সম্পৃক্ত তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।’

র‌্যাব-১ অধিনায়ক শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, ‘পাপিয়াসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে আমরা আগ্রহী। কারণ এখনো আমাদের অনেক প্রশ্নের জবাব দেননি পাপিয়া। তিনি বড় মাপের মাফিয়া। তাকেসহ অন্যদের যারা সহায়তা করেছে তাদের নাম জানার চেষ্টা চলছে। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের নাম পেয়ে যাবো।’

জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে অবৈধ পন্থায় বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন পাপিয়া ও সুমন। গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কিনে হয়েছেন অন্তত কয়েকশ কোটি টাকার মালিক। দেশে গাড়ির ব্যবসার পাশাপাশি বিদেশে দিয়েছেন বার। ধনাঢ্য ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও যৌন ব্যবসাই তাদের মূল পেশা।

গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া জানায়, মাস ছয়েক আগে নরসিংদীতে দোতলা একটি বাড়ি তৈরি করেছেন। পাপিয়া ও সুমনের আলাদা গ্রুপ আছে। তাদের সহায়তা করতেন স্থানীয় নেতারা। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অনেকে অতিষ্ঠ থাকলেও প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না।

এ বিষয়ে র‌্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘তারা মূলত প্রয়াত মেয়র লোকমান হোসেনের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু বর্তমান মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল তাদের বিরোধী ছিলেন। পরে স্থানীয় এক নেতার মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করেন। তারপর থেকে তাদের আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আজ (গতকাল) তাদের পুলিশই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমাদের হেফাজতে নিতে আজ (গতকাল) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। আশা করি দুয়েক দিনের মধ্যে পাপিয়া ও সুমনসহ গ্রেপ্তারদের র‌্যাবের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

পুলিশ ও র‌্যাবের দুই কর্মকর্তা জানান, পাপিয়া ও সুমনের মোবাইল ফোনে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির মোবাইল নাম্বার সেভ করা। ওই ব্যক্তিদের সঙ্গেও তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। গ্রেপ্তারের দিন পাপিয়া র‌্যাব কর্মকর্তাদের হুমকি দেন, ধরার পরিণাম ভালো হবে না বলে হুঁশিয়ারিও দেন। এ সময় মোবাইল ফোনে কয়েকজনের সঙ্গের কথা বলার চেষ্টা করেন পাপিয়া। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। এরপর পাপিয়াসহ চারজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেয়া হয়। এতে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তাদের বিষয়েও আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar