ভিউকার্ডের মত সুন্দর নরওয়ে

পাহাড়ের গা ঘেঁষে ট্রেন চলছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় তিন হাজার ফুটের সে পাহাড় উঠে গেছে আরও হাজার ফুট ওপরে। অন্য পাশে পাহাড়ের ঢাল, নেমে গেছে বহুদূরের সমতলে। যেখানে জনপদের শুরু। সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনবসতির ওপারে আবার পাহাড়ের সারি।বরফে আচ্ছাদিত সবুজ পাহাড়, নীল পাহাড়। চলতি ট্রেনেই কখনো দেখা মিলছে পাহাড়ের ঢালে থরে থরে সাজানো ভিউকার্ডের মত স্বচ্ছ লেকের জল জনবসতি, কখনো আকাশচুম্বী গাছের রেইনফরেস্ট বা সুউচ্চ মালভূমি। কিছুক্ষণ পরে চোখের নিমেষে সেই অরণ্য ঢাকা পড়ছে গাঢ় মেঘের চাদরে। লাক্সারী ট্রেনের জানালা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখার সুযোগ নাই,তবে যখন উপর থেকে নিচে কিংবা বাক ঘুরে পাহাড়ের ট্যানেলে ঢুকে পড়ছে তখন তার পেছনের অংশ চোখে পড়ছে।

প্রত্যেকটা নতুন দেশই জন্ম দেয় নানা নতুন নতুন অভিজ্ঞতার। আর প্রত্যেক দেশেরই থাকে কিছু বিশেষত্ব, যা ওইদেশের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা কে করে তোলে সম্পূর্ণ, সেই বিশেষত্ব গুলোর স্বাদ আস্বাদন না করতে পারলে যেন সেখানকার ভ্রমণই অর্থহীন হয়ে যায়।আমি হয়তবা বুঝাতে পারছিনা, কিংবা নিজেকে জাহির করারও আমার একটুও ইচ্ছা নেই তবে যেটা বলতে চাচ্ছি ঘুরে ঘুরে অনেক কিছুই দেখে বেড়ান ব্যাপার টা যতটা সহজ তেমনি সেগুলোকে লেখনীতে তুলে আনাটা কিন্তু ততটাই কঠিন।

ট্রেন ভ্রমণ কার না ভালো লাগে! ভ্রমণকারীরা যানবাহন হিসেবে পছন্দের তালিকাতে প্রথমেই ট্রেনের নাম রাখেন। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই সড়কপথ, জলপথ, আকাশপথের পাশাপাশি রয়েছে রেলপথ। রেলপথের ধরন, চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ থাকে ।বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর এবং বিস্ময়কর রেলপথের বর্ণনা দেয়া আসলেই কঠিন,তবে আমার কাছে যতটুকু মনে হয়েছে ফ্ল্যাম রেলওয়ে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রেলপথগুলির মধ্যে অন্যতম এবং নরওয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানের মধ্যে একটি। এই রেলপথ দিয়ে ট্রেন খুবই অল্প সময়ের মধ্যে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৬৭ মিটার পাহাড়ের উচ্চতায় নিয়ে যায়।

ফ্ল্যাম রেলওয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম রেললাইনের মধ্যে একটি। ভ্রমণকারীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, চারদিকের পরিবেশ যা সবুজ অরণ্য এবং অকৃত্রিম পর্বতমালার মনোরম সৌন্দর্য্য। এই রেলপথ দিয়ে ট্রেন ছুটে চলার সময় খাঁড়া পর্বতমালা,ব্রিজ,পাহাড়ি ঝর্ণা এবং ২০টি পাহাড়ি সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে, প্রতিটি সুড়ঙ্গের আগে পরে পাহাড়ি বাঁক রয়েছে যা পর্যটকদের নজর কেঁড়ে নেয়। ফ্ল্যাম রেললাইনটি ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। ১৯৪১ সালে এই রেলপথ নির্মাণ করা হয়। তখনকার প্রকৌশলীদের কাছে এটি একটি আশ্চর্য ছিল। স্বপ্নের মত এ রেলযাত্রায় অজস্র টানেল, এবং ঝর্ণা রয়েছে যা যে কাউকে বাকরুদ্ধ করে দেবে। এটি কয়েক ঘন্টার যাত্রা, তবে এত উঁচু থেকে জলপ্রবাহের অজস্র বিশাল প্রবাহগুলি আপনার দৃষ্টিনন্দন করবেই।

সবচেয়ে বড় ঝর্নায় আমাদের পাচমিনিটের উপভোগ্য আর ফটোসেশনের জন্য বিরতি দেয়।নেমে এর নিবিড় আর জাদুকরী মাত্রার দীর্ঘস্থায়ী জল এবং বিভিন্ন অন্যান্য স্থানের উপরিভাগে গ্লাইডিংয়ের অনুভূতিসহ জলপ্রপাতের সৌন্দর্য্যও উপভোগ করছিলাম।ছবি তোলার জন্য এক সুইডিশ তরুনী দারুন হেল্প করছিল পরে সেই আমায় বলছিল শীতকালে এর চারপাশে যখন তুষারপাত হয়, এর অপরূপ সৌন্দর্য তোমার নজর কেড়ে নিবে পারলে উইনটারেও এসো তখন কমপেয়ার করতে পারবে, সেলফী ছবি তুলার কথা বলে, ছবি তুলে রাখ এ সৌন্দর্যের সাথে আমায়ও মনে থাকে যেন।

দুহাজার বারো সালে আমি ইতালীর রোম থেকে সুইজারল্যান্ড গিযেছিলাম।সেসময় ট্রেনে দশ ঘন্টার ভ্রমণ করছিলাম,আল্পস পর্বতমালা হয়ে পশ্চিমঘাট পর্বতমালার সে ট্রেন ভ্রমণ অপরুপ সৌন্দর্য্যের সাক্ষী করবে যে কাউকেই।আমি এই যাত্রাপথের আনন্দ পরতে পরতে উপভোগ করছিলাম।তখন জানতাম সুইজারল্যান্ডের ল্যান্ডওয়াসার রেলসেতু পর্যটক আকর্ষনীয় , সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত রেলপথ। এই রেলপথটি মূলত এই সেতু, সেতুর উচ্চতা এবং এর চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে বিখ্যাত। আল্পস পর্বতের উপর দিয়ে চলা এই রেলপথটি সুইজারল্যান্ড এবং ইতালিকে সংযুক্ত করেছে এবং এই রেলপথটি ইউরোপের সর্বোচ্চ রেলপথ

নরওয়ের এ অবিস্মরনীয় দৃষ্টিনন্দন ফ্লাম ট্রেন জার্নির কাছে বছর সাতেক আগে আমার সেরা অভিজ্ঞতার অনিন্দসুন্দর সেই ইতালী-সুইজারল্যান্ড ট্রেন যাত্রা যেন এখন নস্যিমাত্র।

লেখকঃ রেজাউল মাসুদ, পুলিশ সুপার পিবিআই। (ফেসবুক পোস্ট হতে সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar