ভেজালের প্রমাণ পেয়েও মামলা করেনি সরকারি সংস্থা

খাদ্যে ভেজালের প্রমাণ পেয়েও নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি সরকারি সংস্থা। এমনকি ৫২টি পণ্য বাজার থেকে তুলে নিতে আদালতের আদেশের পরও খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার মামলা পর্যন্ত হয়নি কারো বিরুদ্ধে।

নিয়ন্ত্রক তিনটি সংস্থা বলছে, তারা ভেজাল হিসেবে প্রমাণ পাওয়া খাদ্যপণ্যগুলো বাজার থেকে তুলে নিতে সময় বেঁধে দিয়েছেন। সময়মতো সে কাজ করা না হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে এতদিন ভেজাল খাইয়ে এখন পণ্য তুলে নেওয়াই সমাধান কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খাদ্যে ভেজাল নিয়ে সোচ্চার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক। তিনি বলছেন, বড় কোম্পানিগুলো সব সময় অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে। আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তারা পাত্তা দিচ্ছে না।

গত ১২ মে হাইকোর্ট বাজার থেকে যেসব পণ্য সরাতে বলেছে তার মধ্যে বহুল কাটতি থাকা সরিষার তেল, লবণ, লাচ্ছা সেমাই, ঘিসহ মশলা রয়েছে। 

যেসব পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেছে তার মধ্যে আছে তীর, পুষ্টি ও রূপচাঁদা সরিষার তেল। ওষুধের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায় নামা এসিআইর লবণ ও ধনিয়ার গুঁড়ায় মিলেছে ভেজাল। ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী বাজার দখল করা প্রাণ কোম্পানির হলুদের গুঁড়া, কারি মশলা ও লাচ্ছা সেমাইও গুণগত মানে উত্তীর্ণ নয়।

ভেজালের তালিকায় আরো আছে ড্যানিস ফুড কোম্পানির কারি মশলা, ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজের লাচ্ছা সেমাই, মোল্লা সল্ট লবণ, বাঘাবাড়ি স্পেশাল ঘি, সান চিপসের নাম। ডানকানের মতো নামি প্রতিষ্ঠানের পানিও পানের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়।

রোজার আগে খোলা বাজার থেকে ৪০৬টি পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে বিএসটিআই। পরে তাদের ল্যাব পরীক্ষায় ৫২টি পণ্য অকৃতকার্য হয়। অর্থাৎ এগুলোতে ভেজাল ছিল। নানা সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে চোখে দেখে নমুনা পরীক্ষা না করেই বড় অংকের জরিমানা বা কারাদণ্ডের মতো আদেশ এসেছে। তবে পরীক্ষাগারে অকাট্ট প্রমাণ পাওয়ার পরও এবার বিএসটিআই অনেকটাই চোখ বুঁজে থাকে।

পরে এ নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে উচ্চ আদালত। তবে এখনো সেভাবে গা করেনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। যদিও সংস্থাগুলো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লাইসেন্স স্থগিতের মতো সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে।

আদালতের এই আদেশের পর বিএসটিআই নিম্নমানের পণ্য হিসেবে চিহ্নিত ৫২টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে সাতটির উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করেছে। এ ছাড়া ১৮টি পণ্য উৎপাদনের অনুমোদন স্থগিত করেছে।

অন্যদিকে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের ভেজাল ও নিম্নমানের বলে চিহ্নিত পণ্যগুলো বাজার থেকে সরানোর জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে দায় সেরেছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা এখনো চোখে পড়েনি।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের বেঁধে দেয়া সময় শেষ হলে এসব পণ্যের বিরুদ্ধে তারা অভিযানে নামবেন। কোথাও ভেজাল পণ্য পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে বরাবর সোচ্চার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক মনে করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উদাসীনতাই খাদ্যে ভেজালের ব্যাপকতা বাড়ার কারণ। তিনি মনে করেন, এসব পণ্যের ভেজালের প্রমাণ পাওয়ার পর বিএসটিআই বা অন্য সংস্থার উচিত ছিল তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। আর প্রতিবেদনের সঙ্গে সেই তথ্যও তাদের উচ্চ আদালতে দেওয়া উচিত ছিল।

অধ্যাপক ফারুক বলেন, ‘বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর যাতে সুনাম নষ্ট না হয় সেজন্য অনেক গোষ্ঠী সব সময় কাজ করে। এজন্য আদালত যেসব নির্দেশনা দিয়েছে সেগুলোকে মাথায় রেখে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত হতে হবে। সারা বছর মনিটরিং জোরদার রাখতে হবে। জরিমানা বাড়াতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা করতে হবে। প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখতে হবে।’

‘অনেক দেশে ভেজালকারীদের জেলে না নিয়ে বড় অংকের জরিমানা করে। কখনো জরিমানা দিতে প্রতিষ্ঠান বিক্রি করেও দিতে হয়। এই ভয়ে অন্যরা সতর্ক হয়ে যায়। এখানেও সেটা করতে হবে।’

আদালতের নির্দেশ যা ছিল

৫২টি খাদ্য পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি এসব খাদ্য পণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বাজার থেকে এসব পণ্য সরিয়ে ধ্বংস করা এবং মানের পরীক্ষায় কৃতকার্য না হওয়া পর্যন্ত তার উৎপাদন বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে আগামী ১০ দিনের ভেতর এসব নির্দেশ বাস্তবায়ন করে আদালতে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটি নামে একটি বেসরকারি ভোক্তা অধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান রিট করলে এসব নির্দেশনা জারি করে আদালত।

রিটকারী আইনজীবী শিহাব উদ্দিন ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আদালত এদের সবাইকে (বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর) তিরস্কার করেছে। বলেছে, ভেজাল জানার পরও কেন আইনে দেয়া ক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়নি? শুধু রমজান আসলেই অভিযান কেন, সারা বছর এটা চালু রাখতে বলেছে। আশা করি, সামনে এই নির্দেশনা পুরোপুরি পালন হবে।’

ভেজাল দেওয়া প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শান্তিমূলক ব্যবস্থার আবেদন করেছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে রিটকারী আইনজীবী বলেন, ‘আমরা আসলে সরাসরি কোনো প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করতে হবে সে বিষয়ে আবেদন করতে পারি না। কারণ আইনে সব দেয়া আছে। তাই আমরা চেয়েছি বাজার থেকে ভেজাল পণ্য সরিয়ে নেয়া হোক এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধ আইনি ব্যবস্থা। আদালত সেটিই করেছে। ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং বিএসটিআইকে সেই কাজটি করতে বলেছেন।’

পার পাবে না কেউ: বিএসটিআই

ভেজাল দেওয়ার প্রমাণ পাওয়ার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মান নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থা বিএসটিআইয়ের সংস্থাটির পরিচালক (মান) ইসহাক আলী ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের মুখোমুখি হলে জরিমানা গুণতে হয় এটা ঠিক। কিন্তু এই ৫২টি প্রতিষ্ঠানেরও ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশে আমরা ৪৮ ঘণ্টায় ভেজাল পণ্য সরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছি, যা শেষ হবে শনিবার সকালে। এরপর আমরা অভিযান শুরু করব। যেখানেই যাদের ভেজাল পণ্য পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।’

ভেজাল প্রমাণের পরও ব্যবস্থা না নেয়া এবং নিজেদের মধ্যে সমন্বয় নেই বলে আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা আমাদের মতো করে সব সময়ই কাজ করে যাচ্ছি। আর বিএসটিআইসহ যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় নেই বলে যেটা বলা হয়েছে এটা অনেকটা ঠিক। কারণ এগুলো সব আলাদা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। যে কারণে সমন্বয় করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।’

প্রয়োজনে মামলা করবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ

হাইকোর্ট থেকে বিক্রি নিষিদ্ধ ৫২টি পণ্য বাজার থেকে সরানোর ব্যবস্থা না নিলে নিরাপদ খাদ্য আইনে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. মাহফুজুল হক।

এতদিন ব্যবস্থা না নেওয়ার আদালত থেকে তিরস্কারের কথা অস্বীকার করেছেন চেয়ারম্যান। বলেন, ‘আমাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ভেজাল পণ্য সরাতে। সেই কাজ শুরু হয়ে গেছে। তিরস্কার করেনি। আলটিমেটামের সময় শেষ হলে আমরা অভিযান শুরু করব। প্রয়োজনে মামলা করব। সব আইন অনুযায়ী হবে। কোনো ব্যত্যয় হবে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar