ভেজাল প্রসাধনীতে বাজার সয়লাব

প্রসাধনী ব্যবহার করুন, এক মাসেই ত্বক ফর্সা’ কিংবা মেকআপ ছাড়াই সুন্দরী হোন। সব জায়গায়ই এমন চটকদার বিজ্ঞাপন। এভাবে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেদারসে বিক্রি করা হচ্ছে ‘ত্বক ফর্সাকারী’ প্রসাধনী। বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে নারীরা ত্বক ফর্সা করার জন্য হুমড়ি খেয়ে কিনছে ক্রিম।

142

তারা জানে না এসব ক্রিমে ব্যবহার করা হয় এমন সব উপাদান যাতে ক্যান্সার অনিবার্য। এতে ব্যবহার করা হয় মার্কারি (পারদ), হাইড্রোকুইনসহ নানা বিষাক্ত উপাদন। ক্যান্সার ছাড়াও, কিডনির সমস্যা, মস্তিষ্কে প্রদাহ ও প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দানসহ নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে নারীরা।

দেশে বর্তমানে রং ফর্সাকারী ক্রিমের শতাধিক পণ্যের বড় বাজার আছে। এতে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকার বেশি। আর এর মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানিই স্বল্প সময়ে রং ফর্সা করার কথা বলে পণ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করছে।

hqdefault

সম্প্রতি র‌্যাব বাজার থেকে বোটানিক অ্যারোমা’ নামের একটি কোম্পানির পণ্য নিয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে পরীক্ষা করায়। পরীক্ষায় পণ্যগুলোতে উদ্বেগজনক মাত্রায় ক্ষতিকর হাইড্রোকুইনাইন ও বিষাক্ত মার্কারি (পারদ) থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। বোটানিক অ্যারোমা জেন্টস স্পট আউট ক্রিমে ৪৬৫৭ পিপিএম (মিলিগ্রাম/কেজি), নাইট কুইন ক্রিমে ২৮.৬৩ পিপিএম ও ব্ল্যাক ডায়মন্ড ক্রিমে ১১.১৪ পিপিএম মার্কারির মাত্রা ধরা পড়ে।

অথচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ইতোমধ্যে মার্কারিযুক্ত ক্রিম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতেও প্রসাধনীতে মার্কারি ব্যবহারে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা। একইভাবে বাংলাদেশেও ত্বকে ব্যবহারের জন্য ক্রিমে মার্কারি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বিএসটিআই।

বিশেষজ্ঞরা জানায়, মার্কারির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে কিডনি নষ্ট, গর্ভবতী নারীদের গর্ভের সন্তানের মস্তিষ্ক গঠন বাধাগ্রস্ত হওয়া, হাত-পা অবশ হওয়া, স্নায়ুবিক সমস্যা, চামড়া বিবর্ণ ও রেশ সৃষ্টি হওয়া, ত্বকে ব্যাকটেরিয়া ও ফানগাস হওয়া এবং মস্তিষ্কে বিষক্রিয়া হয়ে মানসিক বিকৃতির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে নগরীর ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রীর পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, ক্রিমের মধ্যে নেভিয়া লোশন, ডাভ লোশন, লাঙ্ লোশন, মাস্ক লোশন, অ্যাকুয়া মেরিল লোশন, ফেডআউট ক্রিম, ওলে ক্রিম, গার্নিয়ার লোশন, জার্জিনস লোশনের নকল পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। আসলের মতো দেখতে কিন্তু নকল বা ভেজাল প্রসাধনী পণ্য তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন কায়দায়। নকল পারফিউমে সোডা-ফিটকিরির সঙ্গে নানা ধরনের সুগন্ধি মিশিয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। নকল শ্যাম্পুতে ব্যবহৃত হচ্ছে নিম্নমানের সাবানপানি ও সুগন্ধযুক্ত ডিশওয়াশ পাউডার। নিচু মানের টুথ পাউডারের ম- তৈরি করে তা ঢোকানো হচ্ছে নামিদামি ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট টিউবে। মোম নামক রং ও সেন্টযুক্ত বিশেষ কেমিক্যালে হাতেই তৈরি হচ্ছে নকল লিপস্টিক।

সরকারি হিসাব মতে, দেশে অনুমোদিত আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও হারবাল ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে ৪৫০টির মতো। কিন্তু অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক হাজার। অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোই যে নিম্নমানের কিংবা ক্ষতিকর ওষুধ বা ক্রিম বাজারজাত করছে, তা-ই নয়, অনেক অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানেও এসব ক্ষতিকর ওষুধ-ক্রিম প্রস্তুত হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষের জ্ঞাতসারে বাজারে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে পোস্টার-লিফলেটের মাধ্যমে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকেও ব্যবহার করছে এসব ব্যবসায়ী নামের অসৎ ব্যক্তিরা। সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকার কারণেই তারা মানুষকে এভাবে ভয়ংকর জীবনের দিকে ঠেলে দিতে পারছে।

অথচ বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টতই বলেছে, চামড়া ফরসা করার জন্য আজ পর্যন্ত কোনো ওষুধ আবিষ্কার করা যায়নি। আমাদের ওষুধ প্রশাসন, বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ সবই জানে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না এসব বন্ধ করার জন্য। দেহের ত্বক ফরসা করার আশায় এবং নানা জটিল রোগের অব্যর্থ ওষুধ হিসেবেও বিক্রি হচ্ছে এসব তথাকথিত হারবাল সামগ্রী।

রাজধানীতে ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রীর বিরুদ্ধে বিএসটিআইর রয়েছে মাত্র ১২ জন মাঠ কর্মকর্তা। রয়েছে ম্যাজিস্ট্রেটের স্বল্পতা। সপ্তাহে দুই দিন ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে বিএসটিআইর ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিবছর রোজার এক মাস আগে বিএসটিআই ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রীর তালিকা করে। সে সময় নকল প্রসাধন সামগ্রীর জন্য অভিযান চালানো হয়। ভোক্তা অধিকার আইনে ভেজাল প্রসাধনী তৈরির জন্য অপরাধীদের দুই বছর জেল কিংবা দুই লাখ টাকা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হয়। মূলত: এ শাস্তিও হয় কালে-ভদ্রে।

এ সুযোগে আসলের মতো দেখতে কিন্তু ভিন্ননামের ভেজাল প্রসাধনী বস্তি ও গ্রাম এলাকা দেদারসে বিক্রি করা হয়। হারবাল ওষুধের নামে ক্ষতিকর প্রসাধন কিংবা ওষুধগুলো যাতে বাজারে যেতে না পারে, সে ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে, সরকারি উদ্যোগে এসব প্রসাধন কিংবা ওষুধ ব্যবহার না করার জন্য প্রচার চালানোও উচিত। যারা ক্রিমের সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে বাজারে ছাড়ছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

মূলত: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথার্থ তৎপরতা থাকলে এমনটি হতে পারত না। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দায়বদ্ধহীনতার দায়ে অভিযুক্ত সবাই।

সূত্র: somewhereinblog.net

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar