#মিটুতে মুখ খুললেন ঢাবির সাবেক ছাত্রী তন্বী

যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতে সারা বিশ্বে আলোড়ন তোলা #মিটু আন্দোলনের সমর্থনে এবার মুখ খুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক ছাত্রী মুমতাহানা ইয়াসমিন তন্বী। বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ২০১১-১২ সেশনের এই শিক্ষার্থী বতর্মানে জার্মানিতে আছেন। ১২ নভেম্বর, সোমবার তিনি সামাজিক যোগযোগের মাধ্যম ফেসবুকে যৌন হয়রানি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন।

পাঠকের জন্য তার স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরা হলো।

‘#Me_Too……

তখন সম্ভবত সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড দুরন্ত আর ছটফটে মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমি ছিলাম বড্ড আনাড়ি। নবম-দশম শ্রেণিতে থাকাকালীনও আমাকে পঞ্চম/ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীর মতো দেখতে লাগত। ছোট-খাটো শুকনা একটা মেয়ে ছিলাম আমি। আমার ছোট মামা আমাকে আদর করে ‘‘লিলিপুট’’ ডাকত। এমনকি আমার পিরিয়ডও হয় অনেক দেরিতে।

এসএসসি পরীক্ষার কিছুদিন আগে মাত্র। এ জন্যই হয়ত নারী-পুরুষের জৈবিক ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে আমার কোনো ধারণাই হয়নি তখনো। ধর্ষণ, যৌন-হয়রানি, টিজ এসব শব্দের সাথে পরিচিত নই তখনো। আমি আগেও বলেছি কয়েকবার, আমি খুবই অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে।

প্রথম ঘটনা: সময়কাল (২০০৪-২০০৫)

যে অমানুষটার কথা আমি বলব, তার নামটা সঙ্গত কারণেই নিচ্ছি না। নাম নিলে লোকে জানবে, কিন্তু কেউ তাকে অপরাধী বলবে না। সম্পর্কে সে আমার ‘‘আঙ্কেল’’ শ্রেণির।

কোনো একদিন শুক্রবারের সকাল। ধরি, অমানুষটার নাম ‘‘শুয়োর’’ (বয়সে আমার থেকে ১৫-১৬ বছরের বড় হবে)। ছোটবেলা থেকে এই শুয়োরের কোলে-পিঠে বড় হয়েছি। শুক্রবার হওয়ায় ওই দিন স্কুল ছুটি। খেলা করতে শুয়োরদের বাড়িতে গিয়েছি। শুয়োরের বাড়ির কেউ একজন বললেন, ‘‘দ্যাখ তো তোর আঙ্কেল এখনো ঘুম থেকে উঠেনি, ডেকে দে।’’ আমি ডাকতে গেলাম শুয়োরকে। শীত থাকায় আমাকে বলল, ‘‘আয় লেপের ভেতর ঘুমা, এত সকালে উঠে কাজ নাই।’’ আমি তখন তসলিমা নাসরিন পড়িনি। তাই আমি জানি না, শুয়োর প্রজাতি ঘরেও থাকে। আমার সেই ছোট্ট শরীরে সে কী করেছিল, তা আমি ঠিক বলতে পারব না। শুধু বলতে পারব, আমি ব্যথা পেয়েছিলাম।

ঘটনা দুই : সময়কাল (২০০৮-২০০৯)

আমি তখন কলেজে পড়ি। আমাকে এখন দেখে হিসাব মিলাতে কষ্ট হবে জানি। তবুও বলি, এই আমি তখনো আঁতলামি পর্যায়ের কেউ ছিলাম। কলেজের হোস্টেলে থাকতাম যশোরে।

আমার ছোট আন্টি তখন চাকরির সুবাদে যশোর থাকত। আমি প্রায়ই আন্টির বাসায় যেতাম। যেহেতু শুয়োর নামের লোকটি আমাদের পরিবারের লোক, তাই সেও মাঝে মাঝে যশোর আসলে আমার হোস্টেলে আসত। আম্মু খাবার-টাবার দিত, তাই নিয়ে আসত।

আমি পূর্বের ঘটনার জন্য তাকে তখনো কেন জানি দোষী মনে করিনি বা খারাপ মানুষ মনে করিনি। কারণ তখনো আমি বুঝে উঠতে পারিনি, সে আমার সাথে যা করেছে, তা জঘন্যতম আচরণ।

তখন নতুন নতুন প্রেম প্রেম ভাব হয়েছে একটা ছেলের সাথে। কেমনে কেমনে শুয়োর জেনে গেল আমি প্রেম করি। যেহেতু আমি প্রেম করি, সেহেতু আমি খারাপ মেয়ে। সুতরাং আমার সাথে আরও খারাপ কিছু করা যায়।

ছোট আন্টির বাসায় আমার আরেকজন কাজিন (আমার সমবয়সী) এসেছে। আমার কাজিনের শখ আমার হোস্টেল দেখবে। ওকে নিয়ে শুয়োর আমার হোস্টেলে আসল। আন্টি আমাকে ফোন করে বলল, ওদের সাথে যেন আন্টির বাসায় চলে আসি।

আমরা তিনজন রিকশাতে উঠব। আগেই বলেছি, আমি দেখতে তখনো অনেক ছোটখাটো, পিচ্চি ছিলাম। তিনজন রিকশাতে উঠতে হলে আমাকেই কোলে বসতে হবে। রিকশাতে কিছুক্ষণ বসার পর টের পেলাম, শুয়োরের হাত আমার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গাতে। আমার ছোট্ট শরীরটা রিকশার ২০ মিনিট সময়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।

আমি আজও রাগে-দুঃখে ফেটে পড়ি কেন সেদিন আমি রিকশা থেকে নেমে পড়িনি, কেন প্রতিবাদ করিনি। আমার চোখ ফেঁটে কান্না বের হয়ে আসে আজও, এখনো। বুকের ভেতরটা তছনছ হয়ে যায়। একটা শুয়োর প্রজাতির মানুষ আমার শরীর স্পর্শ করছে, এটা ভাবতেই আমার গা গুলিয়ে আসে।

নাহ! আমি সেদিনও কাউকেই বলতে পারিনি সেসব কথা। প্রতিবাদও করতে পারিনি আমি। অথচ এমন কোনোদিন যায়নি আমার, যেদিন আমি ঘৃণায় কুঁকড়ে গেছি। অথচ তারপরও আমি সেই শুয়োর লোকটির সাথে কথা বলেছি, স্বাভাবিক আচরণ করেছি।

মুমতাহানা ইয়াসমিন তন্বীর ফেসবুক স্টাটাস।
#মিটুর সমর্থনে মুমতাহানা ইয়াসমিন তন্বী। ছবি: সংগৃহীত

ঘটনা তিন: সময়কাল (২০১১, ৫/৬ ফেব্রুয়ারি)

আগেও একদিন বলেছিলাম, ঢাকায় প্রথম এসে আমি একটা বাসায় সাবলেট ছিলাম। রুমে আরেকজন আপু ছিল, যে কিনা রাত ১০/১১টায় তার বয়ফ্রেন্ডকে রুমে ডেকে নিয়ে আসত।

আমার অস্বস্তি হয়, এটা জানালেই তার সাথে আমার ব্যাপক কথাকাটাকাটি হয়। ঘটনার দিন মেয়েটি আমাকে জানাল, তার বয়ফ্রেন্ড রাতে থাকবে। তারা নিচেই ঘুমাবে, আমি খাটে ঘুমাব।

ভয়ে আমি বাসা থেকে রাত প্রায় ১০টার দিকে বের হয়ে প্রথমেই ফোন দিই আমার ফুফাত ভাইকে (ধরি তার নাম ‘‘শুয়োর-২’’), যে কিনা আমার আপন ভাইয়ের মতো, ঢাকায় পড়াশোনা ও চাকরি করে। সে আমার থেকে বয়সে ৬/৭ বছরের বড় হবে।

শুয়োর-২-কে ফোন করে খুব কান্নাকাটি করে ঘটনা খুলে বললাম। আমার থাকার জায়গা নেই, সে আমাকে তার বড় ভাই-ভাবীর বাসায় রেখে আসতে পারবে কি না বা কোন বাসে উঠতে হবে আমাকে বলতে পারবে কি না, এটা বলে কান্নায় ভেঙে পড়লাম।

শুয়োর জানায়, সে পুরান ঢাকার আশেপাশেই আছে। সে আমাকে এসে নিয়ে যেতে পারবে। তাকে আমি ভরসা করি, আমার আব্বুর আরেক ছেলে সে। (এখানে বলে রাখা ভালো, আব্বু তার তিন ভাগ্নেকে কলিজার টুকরো মনে করে)।

তার জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অপেক্ষা করি আমি। রাত ১১টা বাজে। সে এসে আমাকে নিয়ে বাসে উঠল। (এখানে আরেকটা কথা বলা উচিত। ঢাকায় তখন নতুন এসেছি আমি। ভর্তি, বাসা ভাড়া সব মিলে অনেক টাকা খরচ হয়েছে আব্বুর। আমরা মোটামুটি গরিব পরিবার। যেখানে টুকিটাকি সংসার চলে আমাদের, সেখানে আমার বাপের শখ করে মেয়েকে ঢাকা শহরে পড়ানোর মত মেধাবী হয়ে গিয়েছিলাম আমি। তবুও আমি খুব দায়িত্বশীল মেয়ে। আব্বুর খুব বেশি টাকা খরচ হয়েছে আমি বেশ বুঝতে পারি। যাতে বেশি খরচ না হয়, তাই দিনে একবেলা-দুবেলা খাই। নতুন এসেই টিউশনি খুঁজি। মাস দুয়েক ঢাকায় এসে শুকিয়ে কেমন যেন রোগাটে হয়ে গিয়েছি আমি। তা ছাড়া গত কয়েকদিন ধরে রুমমেটের সাথে ঝামেলা হওয়াতে ঠিকমতো খাওয়ার সময়টাও পাইনি, এমন একটা পরিস্থিতি আমার)।

আমার মোশন সিকনেস আছে। গাড়িতে উঠলে বমি হয়। সদরঘাট থেকে গুলিস্তানে আসতেই কয়েকবার বমি হয়ে গেল আমার। ক্লান্ত আমি শুয়োর নামক ভাইয়ের কাঁধেই ঘুমিয়ে গেলাম। আমার ভাই, আহা কত নিশ্চিন্ত জায়গা!

ঘুম থেকে উঠলাম রামপুরা-বাড্ডা এলাকাতে। শুয়োর নামক ভাইয়ের অফিস সম্ভবত ওই এলাকাতে। আমি তখনো ঢাকার কিছুই চিনি না। জিজ্ঞেস করলাম মিরপুর পৌঁছাতে আর কতক্ষণ? যেহেতু তখন অনেক রাত, (১২টার বেশি) সে আমাকে বলল, মিরপুরের রাস্তায় জ্যাম অনেক। তা ছাড়া হুটহাট করে কেউ বাসায় গেলে ভাবী বিরক্ত হয়। তা ছাড়া মিরপুরে গেলে সকালে উঠে অফিস যেতে পারবে না। আর তার বাসায় আরও ছেলেরা থাকে (মেস), সুতরাং সেখানেও যাওয়া যাবে না।

ঢাকায় আমার আর কেউ নাই। আমি অসহায়ের মতো বললাম, ‘‘তাহলে আমাকে গাবতলীতে কোনো একটা বাসে তুলে দেন, আমি বাড়ি চলে যাই।’’

শুয়োর বলে, ‘‘এমনি এমনিই চলে যাবি? তোর ওই বদমায়েশ রুমমেটকে কিছু না বলেই চলে যাবি কেন? আমি কাল তোকে নিয়ে ওই বদমায়েশ মেয়েটার সাথে কথা বলতে যাব, তার এত সাহস হয় কেমনে।’’

‘‘কিন্তু থাকব কোথায়?’’ সে বলে পাশেই একটা আবাসিক হোটেল আছে, আজকের রাত এখানে থাক। হোটেল শুনে ভয় পেয়ে গেলাম। ভাইটি আমার মাথায় হাত রেখে বলল, ‘‘মনি এত ভয় পেলে চলে?’’ (আমাকে সে মনি বলেও ডাকত।) জীবনটা খুব কঠিন। কখন কী হয় তার মোকাবেলা করতে হবে।’’

আমার ভাই সে। আপন না হোক, ভাই তো!! অপরিচিত রুমমেটের বয়ফ্রেন্ডের সাথে এক বাসায় থাকতে সমস্যা। কিন্তু এ তো আমার ভাই। মায়ের পেটের না হোক, আমার ভাই। ঢাকায় আপাতত এই ভাইটিই আমার একমাত্র আপন।

আমার কাছে তো বেশি টাকাও নাই, সেও খুব ভালোভাবেই জানতো তার মামার গরিবি হাল। আমাকে বলে, ‘‘এখন ঢাকায় এসেছিস ভালো জামা-কাপড়, ভালো জুতা না পরলে হয়? কী জুতা পরেছিস, ছিড়ে গেছে প্রায়!! আচ্ছা কাল আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তোর রুমমেটকে গিয়ে ঠিকমতো ঝাড়ি দিয়ে আসব। আর আমি তো জানি, মামার এখন টাকা-পয়সার সমস্যা চলছে, তোকে আমি শপিং করে দিব।’’

বড় ভাই আমার!! আমার কত আপনজন!! আমার কত খেয়াল করে!! চোখে আমার পানি চলে আসল। ছোটবেলা থেকেই গরিবি হালে বড় হয়েছি। কেউ কিছু দিলে খুশিতে চোখ জ্বলজ্বল করত।

বড় ভাই আমার, অভিভাবক আমার। তার সাথে বাড্ডার একটা হোটেলে উঠলাম। একটাই রুম!! এটাই আমার সেদিনের রাতের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা, নিরাপদ মানুষের সাথে।

জ্বি! আমার এখনকার জ্ঞান দিয়ে আমার সেই সতের/আঠার বছরের আমিকে বিচার করবেন না আশা রাখি।

আমার কাছে এটাই স্বাভাবিক ছিল। রুমে একটাই বিছানা, আরেকটা সোফা আর একটা টিভি। ভাই বলল, তুই কোনটাই শুবি? আমি বললাম, ‘‘আমি টিভি দেখি। আপনি বিছানায় ঘুমিয়ে পড়েন।’’

(আমাদের বাড়িতে টিভি ছিল না, তাই টিভির প্রতি আমার বেশ আকর্ষণ ছিল। টিভি পেলে আমি সারা রাত দিন কাটিয়ে দিতে পারতাম।)

ভাই শুয়ে পড়ল। আমি বসে বসে টিভি দেখি। হঠাৎ তার কী মনে হলো, সে আমাকে টানতে টানতে খাটে নিয়ে গেল। আমার চিৎকার, আমার আর্তনাদ তার কানেই গেল না। আমি হতবাক হয়ে গেলাম৷ সমস্ত শক্তি দিয়ে আমি চিৎকার করলাম।

আমার সামান্য চুপ থাকাতে কলেজে রিকশার ভেতর শুয়োর নামের লোকটি যে আচরণ আমার সাথে করেছিল, সেটা আমি দ্বিতীয়বার আমার সাথে ঘটতে দিতে পারি না।

আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে ঠেলে ফেলে রুমের সাথে এটাস্ট বাথরুমে গিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে দিলাম। ধস্তাধস্তিতে অনেক শব্দ হয়েছিল। সাথে সাথেই হোটেল কর্তৃপক্ষ দরজাতে করাঘাত করতে থাকল। দরজা খুলে সে হয়ত বলতে চেয়েছিল কিছু হয়নি। তৎক্ষণাৎ বুদ্ধি খাটিয়ে আমিও বাথরুমের দরজা খুলে ওই লোকটিকে বললাম ঘটনাটা।

ভয় ছিল, না জানি এই লোকটা আমাকে বিশ্বাস করবে কি না। লোকটির হয়তো আমার নিরীহ চেহারা দেখে মায়াবোধ হলো। সে আমার পরিস্থিতি বুঝল। একটা বারও বলল না, আমি নিজেই তো তার সাথে হোটেলে আসলাম। সুতরাং এটা আমারই দোষ। অথচ এখনো একটা মেয়ের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটলে শিক্ষিত শ্রেণির লোকেরাও মেয়ের দিকে আঙুল তোলে!!

সেই রাতে হোটেলের অপরিচিত লোকটার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ, সে আমাকে বিশ্বাস করল। আমার হয়ে শুয়োর নামের ভাইটিকে একটা থাপ্পড় মেরেছিল।

সে এই শিক্ষিত নামধারী শুয়োর নয়। ওই লোকটি আমার পরিস্থিতি বুঝল। আমাকে আলাদা রুমে পাঠিয়ে, সে হোটেলের আর দুইটা মহিলা কর্মচারীকে ডেকে আমাকে সাহস দিলেন।

ইতোমধ্যে আমার সাবেক প্রেমিক এবং আমার বড় ভাইয়ের এক বন্ধুকে ফোন দিলাম। তারা ঢাকায় থাকাতে আমাকে নিতে আসল, সেই রাত ২টার দিকে। ভয়ে আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল। ওই রাতটা আমার জন্য কতটা ভয়ঙ্কর ছিল, কতটা কালরাত ছিল, তা হয়ত আমার লেখাতে বোঝা গিয়েছে কি না জানিনা। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে আমি লিখছি আর ভাবছি, আমি ভেবেই যাচ্ছি, আমার সাথে তিন তিন বার এই ঘটনা ঘটল। আমার জীবনের সর্বশেষ কালরাত সেটা।

★★★

তারপর অনেক দিন, অনেকগুলো মাস, বছর পেরিয়েছে। আমিও একটু একটু করে বড় হয়েছি, কঠোর হয়েছি, শক্তিশালী হয়েছি, সাহসী হয়েছি। আমি সেই ছোট্ট ভোলাভালা মেয়েটি থেকে কঠিন হয়েছি।

এই যে আমি এত সাহসী, এত স্পষ্টভাষী, এত নিষ্ঠুর, এত তেজি, এটা আসলে একদিনে হইনি। আমাকে হতে হয়েছে। আর এই তেজি মেয়েটিকে যেই মানুষটা আরও বেশি সাহসী বানিয়েছে, সেই মানুষটি জাহিদ। সবাই জানে, আমি জাহিদ বলতেই পাগল। আসলে সবাই সবটা জানে না।

জাহিদও হয়তো সবটা জানে না, এই তেজি, সাহসী আর নিষ্ঠুর মেয়েটা তাকে অসম্ভব ভালোবাসে। সেই যে আমার স্বপ্ন দেখা মানুষটি, যার জন্য আমি সব ছেড়ে দিতে পারি!!!

এরপর অনেক দিন গিয়েছে। এইসব ঘটনা আম্মুকে বলতে পেরেছি কিছুদিন আগে। অথচ আম্মুর ভীতসন্ত্রস্ত প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘‘জাহিদকে বলেছিস নাকি?’’

আমি বললাম, ‘‘কেন বলব না?’’

আম্মুর ভয়, জাহিদ জানলে কবে না জানি খোঁটা শুনাবে। যদি আমাকে ছেড়ে যায়।

আমি মনে মনে হাসলাম, পৃথিবীতে শুয়োর প্রজাতির পুরুষ ছাড়াও আরও এক প্রজাতির পুরুষ আছে। যারা এই ক্ষত-বিক্ষত, পচা-দুর্গন্ধ সমাজ থেকে কয়েক মিলিয়ন মাইল দূরত্বে বসবাস করে।

হয়তো জাহিদ কোনোকালে আমাকে ছেড়ে গেলেও যেতে পারে, হয়তো আমরা আলাদা হয়ে যেতেও পারি, সম্ভাবনা থাকতেও পারে। কিন্তু আমি জানি সেটা এই কারণে নয়। তবুও আমি জাহিদকেই ভালোবাসব। ওকে সম্মান করব। এই যে আমাকে তুলতুলে মেয়ে থেকে কঠিন মেয়ে হতে সাহায্য করেছে, তার জন্য আমার সম্মান চিরকাল থেকে যাবে।

তারপরও আরও দিন গিয়েছে….. আমি জানি জাহিদ আমাকে সম্মান করে। এই যে আমি আজ মুখ ফুটে বলতে পেরেছি, তাতে জাহিদ আরও সম্মানিত বোধ করবে, ওর অর্ধাঙ্গী সাহসী। ওর গর্ব হবে, আর কোনো পুরুষ নামক শুয়োর ওর প্রেমিকাকে ছুঁতে পারা তো দূরে থাক, চোখ দিয়ে কুদৃষ্টিও দিতে পারবে না। পুরুষ নামক শুয়োরদের শাস্তি দেবার মতো ক্ষমতা জাহিদের প্রেমিকার আছে।

এরপর আরও দিন যাবে, কোনো মা ভয় পাবে না। কোনো মা মেয়েকে চুপ করিয়ে দিবে না। ‘তোর বরকে বলিস না’ বলে আদেশও দিবে না। মায়েরা সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে ধর্ষকদের শাস্তি দিবে।

এই সমাজ, এই রাষ্ট্র সবাই ধিক্কার জানাবে, শাস্তি দিবে, ঘৃণা করবে, তাদের ময়লা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে। আমি জানি, আমি বেশ জানি।’

হলিউডের প্রযোজক হার্ভি ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে #মিটু আন্দোলন। হলিউডের পর বলিউডের কিছু অভিনেত্রীও ইতোমধ্যে হেনস্তার স্বীকার হওয়ার কথা জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। যৌন হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পদত্যাগ করেছেন প্রতিমন্ত্রী ও আলোচিত সাংবাদিক এম জে আকবর।

বাংলাদেশেও কয়েকজন নারী যৌন হয়রানির স্বীকার হওয়ার অভিযোগ এনেছেন। ‘মিস আয়ারল্যান্ড’ মাকসুদা আক্তার প্রিয়তি ২৯ অক্টোবর প্রথম একটি পোস্ট দিয়ে অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশের রংধনু শিল্প গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ২০১৫ সালে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন।

প্রিয়তি বিবিসি বাংলাকে জানান, এ ঘটনা নিয়ে আইরিশ পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি, যা ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশে যাবে।

নারী অধিকার কর্মী ও সাংবাদিক সুপ্রীতি ধরের মেয়ে শুচিস্মিতা সীমন্তি সাংবাদিক প্রণব সাহার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে ৩০ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।এরপর থেকেই এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। ঘটনার এক সপ্তাহ পর ফেসবুকে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন প্রণব।

এই দুটি ঘটনার পর আরও কয়েকজন নারী বিভিন্ন সময় হেনস্তা হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar