‘শেখ হাসিনাকে বারবার চাই না, আরেকবার চাই’-মানে কী?

ওবায়দুল কাদের। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ সরকারের সড়ক ও সেতুমন্ত্রী। সবসময় কর্মব্যস্ত। বিশেষত সড়কের বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তার ত্রস্ত তৎপরতা লক্ষ করার মতো। সঙ্গে পারিষদ দল এবং মিডিয়ার লোকজনদের সম্মিলিত কুচকাওয়াজ তার কর্মতৎপরতার স্বীকৃতি হিসেবে সকলেই মেনে নিয়েছেন। আর প্রমিত বক্তব্য প্রদানের অমিত প্রয়াসে ওবায়দুল কাদেরের তুলনা মেলা ভার। তার বলার স্টাইল সম্পূর্ণ তার নিজস্ব এবং মুখভঙ্গীতে ও হাতের ব্যবহারে বঙ্গবন্ধুর উদ্দীপ্ত তৎপরতাও লক্ষ করার মতো।

এ হেন দক্ষতার অধিকারী ওবায়দুল কাদেরের হাতের কব্জির জোর আমরা সাংবাদিক হিসেবে তার কলমে যেমন দেখেছি, তেমনি সম্প্রতি তার কলম থেকে নির্গত কথাসাহিত্যের স্ফুরণ চলচ্চিত্রজগতের মানুষদেরও যে নাড়া দিয়েছে এবং সেই দুলুনিতে তার উপন্যাস ‘গাঙচিল’ এখন চলচ্চিত্ররূপ পাচ্ছে, সেটাও আগ্রহ নিয়ে দেখছি! সেদিন চলচ্চিত্র নির্মাণের শুভমহরতে সুন্দরী নায়িকা এবং অন্যান্য কলাকুশলীর পাশে তাকে যে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দেখলাম, তাতে আমার মনটা ‘বিগলিত করুণা, জাহ্নবী যমুনা’ হয়ে গেলো! বহুদিন ওবায়দুল কাদেরের এমন হাসিমাখা মুখ আমি দেখিনি। জানি না, সেই আনন্দেই কিনা, ওবায়দুল কাদের এখন আমার সহপাঠী শেখ হাসিনার জন্য অনেক অগ্রগামী কথা বলে ফেলছেন! কিছুদিন আগে পদ্মাসেতু ‘শেখ হাসিনা পদ্মাসেতু’ নামকরণের জন্য ওবায়দুল কাদের আগ বাড়িয়ে কথা বলেছিলেন। কেন বলেছিলেন?

শেখ হাসিনার গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে? অসম্ভব। আমি তখনই মুখগ্রন্থে তার উত্তরে লিখেছিলাম, এটা করা ঠিক হবে না। আমি কি বুঝেছিলাম, শেখ হাসিনা এতে আপত্তি করবেন? না, আমি বুঝে বলিনি। ধারণা থেকে বলেছিলাম। কী ধারণা সেটা? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগেরবারের সময়েই যমুনাসেতু নির্মাণ করার পর এই সেতুর নাম দেয়া হয়েছিলো ‘বঙ্গবন্ধু যমুনাসেতু’। কিন্তু লোকমুখে কখনো এই নামে সেতুর নাম বলতে শুনিনি। সকলেই বলতো ‘যমুনাসেতু’। এখনো তাই বলে।

ফলে বঙ্গবন্ধুর নামে রাখা সেতুর তাতে অবমাননা না হলেও আমি মনে করি, জাতির পিতার এতে অবমাননা হয়েছে। আমি চাইনি, শেখ হাসিনাও একইভাবে অপমানিত হোক। হাসিনা হয়তো সেই চিন্তা থেকে পদ্মাসেতুর নামকরণে আপত্তি করেননি কিংবা সেটা ভেবেও করে থাকতে পারেন। আমি তা জানি না। কিন্তু তাঁর মহৎ, উদার ও নির্লোভ হৃদয়ের যে পরিচয় আমরা পেয়েছি, তাতে তিনি যে এটিকে সহজে গ্রহণ করবেন না, এটুকু অন্তত বুঝেছিলাম। তা হলে ওবায়দুল কাদের কেন বুঝতে পারলেন না? এটা আমাদের কাছে এক কৌতুকপ্রদ বিস্ময়!

এই বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই তিনি আবার এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসলেন। আওয়ামী লীগের জনসংযোগ কর্মসূচিতে যখন নেতা-কর্মীদের মুহুর্মুহু শ্লোগান ছিলো, “শেখ হাসিনার সরকার/বারবার দরকার।” প্রতিউত্তরে কী বললেন তিনি? “না, শেখ হাসিনাকে বারবার চাই না, আরেকবার চাই। আরেকবার দরকার। আরেকবার এলে দেখা যাবে।” এ-কথার মানে কী? অসংখ্য নেতাকর্মীর হৃদয়োৎসারিত আকাক্সক্ষা যখন বারবার শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় দেখার, তখন তিনি হঠাৎ একবারের কথা বললেন কেন? এ-কথা বলে তিনি কী বোঝাতে চাইলেন?

তিনি কি বুঝে গেছেন, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসতে পারবেন না? তা না হলে তার কণ্ঠে কেন এই আকুতি? তিনি কি আত্মবিশ্বাসী নন যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে যে বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধন করেছেন, তা আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ তো দূরের কথা, অনেকক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশই করতে পারেনি? এই বিস্ময়কর অগ্রগতির কথা যেখানে জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় নেতা ও সংস্থা মেনে নিয়েছেন, সেখানে কোন্ আশঙ্কা কিংবা কোন্ রহস্যময় কারণে তিনি এমন একটি করুণ আকুতির কথা বলে ফেললেন?

এর মধ্য দিয়ে যে আওয়ামী লীগের দুর্বলতার কথাই প্রকাশিত হলো, তা তো ওবায়দুল কাদেরের মতো নেতার না বোঝার কথা নয়! এই কথার ফলে যারা আওয়ামী লীগকে আর একমুহূর্ত ক্ষমতায় দেখতে চায় না, তাদের অন্তর্গত উল্লাসের কারণ ঘটলো না? এখন ওবায়দুল কাদেরের কথার প্রতিধ্বনিতে যদি এ-থেকে ষড়যন্ত্রকারীরা ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করে, তখন? অতএব আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কথা বলার সময় ওবায়দুল কাদেরকে আরো সতর্ক হতে হবে, এটাও কি তাকে বলে দিতে হবে?

লেখক : অসীম সাহা, কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar