সংবিধান, সাংবিধানিক ভাবনা এবং কিছু কথা

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের দলিল হচ্ছে সংবিধান। সংবিধানের প্রস্তাবনা সহ বিভিন্ন অনুচ্ছেদে দেশের নাগরিকদের ‘মালিক’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে জনগণের এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দায়িত্ব বাতলিয়ে দেওয়া হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণকে আইন মান্য করা এবং শৃংখলা রক্ষার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের প্রতি সর্বাবস্থায় জনগণকে সেবা প্রদানের জন্য নির্দেশ আছে। সরকারী কর্মকর্তা বা কর্মচারী সম্মানিত ব্যক্তি-তাদেরকে যথাযথ সম্মান প্রদান কাম্য; তার মানে এই নয় যে দেশের যে সাধারণ নাগরিক হোক সে কুলি-মজুর বা শ্রমিক তার কোন সম্মান নেই। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ‘স্যার’ বলে অভিবাদন করতে হবে এমন কোন আইন আছে বলে আমার জানা নেই…

আমাদের প্রশাসনতন্ত্র বৃটিশ লিগ্যাসি থেকে এসেছে। বৃটিশরা সাত সমূদ্র পার হয়ে এদেশে এসেছিল; আমাদের থেকে খাজনা নিয়ে তাদের দেশকে তারা সাজিয়েছে; খাজনা না দিলে দেশের নাগরিকদের প্রতি জেল-জুলুম চলতো-তাদের ভয়ের রীতি চাপিয়ে দেওয়ার জন্য বৃটিশ অফিসারদের ‘স্যার’ বলে সম্মোধন করতে হোত। কিন্তু এখন বৃটিশরা নেই, দেশের মালিক এখন জনগণ-তাহলে কেন আমরা সেই পুরোনো ধাঁচ থেকে বের হতে পারবো না?

দেশের নাগরিকদের খাজনার পয়সা সহ বিদেশী ঋণের টাকায় আমাদের বাজেট হয়-ঋণের সুদ এবং আসল আবার জনগণের পয়সা দিয়েই পরিশোধ করতে হয়। মজার বিষয় বাজেটের একটি বড় অংশ হয় প্রতি বছর ব্যয় হয় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা পরিশোধে…দুঃখের বিষয় হচ্ছে যাদের পয়সায় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা হয় সেই নাগরিকগণ যখন সরকারী অফিসে সেবা নিতে আসেন তখন তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার না করা বা সেবা না দেওয়া বা ‘স্যার’ সম্মোধন না করলে গোস্যা করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অসুস্থ মানসিকতা, হীনমন্যতা এবং শিক্ষার দীনতা বৈ আর কিছু-ই নয়।

ফেসবুকের সংবাদে নির্ভর করা ঠিক নয় তারপরেও কিছুদিন আগে একটী খবর বেশ ভাইরাল দেখলাম…এক ইউ,এন,ও নাকি তাকে ‘স্যার’ না বলায় সাংবাদিকদের শাসিয়েছেন… ঘটনা সত্যি হয়ে থাকলে সেটি দূর্ভাগ্যের। সবশেষ ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের একটি উদাহরণ সেখানে এক শুনানীকালে আদালত তথাকথিত কলোনিয়াল মানসিকতা থেকে বের হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত রেখেছেন… শুনানীকালে আদালত জজ সাহেবদের ‘মাই লর্ড’ বা ‘ইয়োর লর্ডশীপ’ বলাকে বাধ্যতামূলক বলেন নি বরং আদালতের ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে যেকোন মর্যাদাপূর্ণ সম্ভাষণে মাননীয় বিচারপতিদের অভিবাদন করার কথা বলেছিলেন। সর্বোপরী, সম্মান বিষয়টি অন্তরগ্রাহ্য এবং আপেক্ষিক। সেবা প্রদানের মাধ্যমে জনগণ থেকে ভালোবাসা এবং সম্মান অর্জন করতে হয়-ভয়ের সংস্কৃতির মাধ্যমে নয়-এটা প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে রাখাই কাম্য।

(বিচার মো. আল-ইমরান খান এর ফেসবুক পোস্ট হতে সংগৃহীত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar