সহকারী জজ নিয়োগে ভাইভায় যে বিষয়গুলো জানা দরকার

একাদশ বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় লিখিত পর্বের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। খুব শিগগিরই ভাইভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিজেএসসি। আশা করি, পরীক্ষার্থীরা এরমধ্যেই প্রস্তুতি গুছিয়ে এনেছেন। তবে শেষ সময়ে আরো কিছু বিষয়ে নজর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিলে ধরা দিবে সাফল্য।

কটি সফল ইন্টারভিউ/ভাইভা, একজন চাকরি প্রার্থীর জীবনে একটা সুখবর এনে দেয়। আপনার সফলতা নির্ভর করে এই শেষ পর্বের কারিশমার ওপর। তাই ভাইভা চলাকালীন সময় আপনাকে অবশ্যই বেশ কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে ভাইভা/ইন্টারভিউটা সবদিক দিয়ে আপনার পক্ষেই থাকে। ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ, বসা, বেরোনো ও উত্তর দেয়ার সময় প্রার্থীর আচরণ, কথাপোকথন, বাচনভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রে প্রার্থীর সফলতা ও ব্যর্থতার কারণ হতে পারে। ভাইভা বোর্ডে একজন ভাল শ্রোতা হয়ে মনোযোগ দিয়ে প্রশ্ন শুনুন এবং স্পষ্ট, সুন্দর, সাবলীলভাবে গুছিয়ে ও ধীরস্থিরভাবে উত্তর দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আত্মবিশ্বাসের সাথে সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নকর্তার সঙ্গে চোখে চোখ রেখে হাসিমুখে উত্তর দিন। কোন বিষয় না জানা থাকলে বিনয়ের সঙ্গে জানান। প্রশ্নকর্তার নিকট কোনো ভাবেই ভুল তথ্য উপস্থাপন করবেন না এবং ভাসা ভাসা জ্ঞানের উপর নির্ভর করে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে না।

একজন সহকারী জজ/ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগে সফল হতে হলে আপনাকে অবশ্যই সিলেবাসের অর্ন্তভূক্ত আইনগুলোর মূল বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখতে হবে। বিশেষভাবে বাংলাদেশের সংবিধান, সংবিধানের ১ম সংশোধনী থেকে শুরু করে সর্বশেষ ষোড়শ সংশোধনী পর্যন্ত এবং সংশোধনীর বিষয়বস্তু, সাল, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ এবং হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারসহ বিখ্যাত কিছু মামলার নজির ইত্যাদি বিষয় ভাইভার জন্য খুবই গুরুপ্তপূর্ণ। দেওয়ানী আইনসমূহের মধ্যে দেওয়ানী কার্যবিধি আইনের ক্ষেত্রে মূল আইনের ধারাগুলোর উল্লেখযোগ্য হলো দেওয়ানী আদালতের এখতিয়ার, মোকদ্দমা স্থানান্তরের ক্ষমতা, রেস-সাবজুডিস, রেস-জুডিকেটা, কমিশন, আপীল, রিভিউ, রিভিশন, আদালতের অর্ন্তনিহিত ক্ষমতা সংক্রান্ত ধারাগুলো এবং এই বিষয়গুলো ভালভাবে স্মরণে রাখতে হবে। তবে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে আদেশ-০১ মোকদ্দমার পক্ষগণ, আদেশ-০৫ সমন দেওয়া ও সমন জারী, আদেশ-০৬ প্লিডিংস, আদেশ-০৭ আরজী, আদেশ- ০৮ লিখিত জবাব, আদেশ-০৯ পক্ষগণের হাজিরা ও গরহাজিরার পরিণাম, আদেশ -১১ আবিষ্কার ও পরিদর্শন, আদেশ-১৭ মূলতবি এই বিষয়গুলো ছাড়াও আদেশ-২০,২২,৩৯, ৪৫,৪৬,৪৭ এগুলো সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। সুর্নিদিষ্ট প্রতিকার আইনের স্থাবর সম্পত্তির বেদখল পুনরুদ্ধার, দলিল সংশোধন, দলিল বাতিল, ঘোষণামুলক ডিক্রি, নিষেধাজ্ঞা ( অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা) ইত্যাদি বিষয়গুলোয় পুনরায় চোখ বুলিয়ে নিন। সাক্ষ্য আইন হতে সাক্ষ্য কি, কোন কোন বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেয়া যায়, স্বীকৃতি (ধারা-১৭ টু ধারা-৩১), স্বীকারোক্তি, দলিল, দালিলীক সাক্ষ্য, মৌখিক সাক্ষ্য এবং আদালতের দৈনন্দিন সাক্ষ্য গ্রহনের জন্য এই আইনের ৩য় খন্ড অর্থাৎ সাক্ষ্য উপস্থাপন ও উহার ফলাফল অর্থাৎ অধ্যায়-৭ হতে প্রমানের দায়িত্ব (Burden of Proof), Estoppel, জবানবন্দী (Examination-in-chief), জেরা (Cross-examination), পুনঃজবানবন্দী ( re-examination), সাক্ষ্য গ্রহনের ক্রম, ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন ( Leading questions) এবং স্যুট ভ্যালুয়েশন আইনের -১১ ধারা অর্থাৎ মোকদ্দমা বা আপীলে মূল্যমান সঠিক মূল্যায়ন না হলে কি হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। ফৌজদারী আইন সমূহের মধ্যে ফৌজদারী কার্যবিধি আইন হতে আদালতের গঠন, প্রকারভেদ, চার্জ, বিচার পদ্ধিতি, জামিন, আপীল এবং রিভিশন নিয়েও জেনে নিতে হবে। কোয়াশমেন্ট, ১৪৪/১৪৫ ধারা, সংক্ষিপ্ত বিচার এবং দন্ডবিধি আইন হতে জেনারেল এক্সসেপশনস বা সাধারণ ব্যতিক্রমসমূহ, শাস্তিসমূহ এবং অধ্যায় ১৬- মানুষের শরীর বা মানবদেহ সম্পর্কিত অপরাধসমূহ খুন, অপরাধজনক নরহত্যা, আঘাত (Hurt) অপহরন (Kidnapping), অপবাহন, অবৈধ আটক ও অবৈধ অবরোধ, ধর্ষণ ইত্যাদি এবং অধ্যায়-১৭ সম্পওি সম্পর্কিত অপরাধ চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা, ডাকাতি, প্রতারনা, জালিয়াতি, তফশীল এবং Special Power Act-1974 এর prejudicial Act কোনগুলো, কোন কোন অপরাধের বিচার এই আইনে করা হয়, স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচার পদ্ধতি, তদন্ত পদ্ধতি, Advisory Board এর গঠন, সান্ধ্য আইন, স্মাগলিং সহ এই আইনের অধীন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উপায় এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ক্ষেত্রে অপহরন, নারী ও শিশু নির্যাতনের শাস্তি, যৌতুকের শাস্তি, ধর্ষনের শাস্তি, স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল গঠন, বিচার পদ্ধতি, তদন্তের পদ্ধতি ও সময়সীমা, জামিন এবং শিশু আইন -২০১৩ এর শিশুর সংজ্ঞা, প্রবেশন কর্মকর্তার নিয়োগ, দায়িত্ব ও কর্তব্য, শিশু কল্যাণ বোর্ড ও উহার কার্যাবলী, শিশু বিষয়ক ডেস্ক ও শিশু বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা, শিশু আদালত গঠন, আদালতের ক্ষমতা ও কার্যাবলী, গ্রেফতার, তদন্ত ও শিশুর উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং যৌতুক নিরোধ আইনের অধীনে যৌতুকের সংজ্ঞা, যৌতুক গ্রহণ ও প্রদানের শাস্তি, অপরাধের আমলযোগ্যতা এবং বাল্য বিবাহ নিরোধ আইনের অধীনে বাল্য বিবাহ সম্পাদন বা পরিচালনার শাস্তি, অপরাধের আমলযোগ্যতা, বিচার ইত্যাদি উপরোক্ত বিষয়গুলোর উপর দক্ষতা রাখতে হবে।

সিলেবাসের বিশেষ আইন গুলোর মধ্যে তামাদি আইনের অধীনে মামলা, আপীল ও দরখাস্তের ক্ষেএে তামাদির মেয়াদ, তামাদির সময় হিসাব, Easement এবং Negotiable Instruments Act এর অধীন Negotiable Instruments এর সংজ্ঞা, চেক এর সংজ্ঞা, চেক ডিসাঅনারের কারণ এবং প্রতিকার এবং কোথায় মামলা দায়ের করতে হয় এবং মামলা দায়েরের পদ্ধিতি ও বিচার পদ্ধতি ও আপীল সংক্রান্ত বিধানাবলী। SAT & NAT আইনের অধীনে অগ্রক্রয় (Pre-emption) এবং এদের পার্থক্য, রিডেম্পশন, বিভিন্ন ধরনের জরিপ এবং খতিয়ান এর ইতিহাস এবং জেনারেল ক্লোজেস আইনের ০৩ -ধারা সহ ধারা-০৬, ০৭, ০৮, ০৯, সিভিল কোর্টস আইনের দেওয়ানী আদালতের প্রকারভেদ, আদালতসমূহের এখতিয়ার, স্মল কজেজ কোর্টের এখতিয়ার, স্ট্যাম্প আইন হতে -ধারা -১১ এবং কোন প্রকারের দরখাস্তে কত টাকার স্ট্যাম্প লাগাতে হয়, দরখাস্তে স্ট্যাম্প না লাগানোর ফলাফল, কোন কোন ক্ষেএে স্ট্যাম্প বাবদ বিশেষ সুবিধা রয়েছে, কোর্ট ফিস আইন অনুযায়ী কোর্ট ফির প্রকারভেদ, কোন প্রকারের মোকদ্দমায় কত টাকার কোর্ট ফি দিতে হয় এবং এই আইনের তপশীল বিষয়ে ধারণা রাখতে হবে।

সম্পওি হস্তান্তর আইন হতে সম্পওি হস্তান্তর কি, কি কি হস্তান্তর করা যায়, কে হস্তান্তরের যোগ্য কে, Doctrine of Election, lispendence, part-performance, fraudulent transfer, marshalling, বিক্রয়, রেহেন (mortgage) দান, ইজারা, বিনিময়(Exchange) ইত্যাদি বিষয়াবলীর উপর নজর দিতে হবে। আবার রেজিস্ট্রেশন আইন এর দলিল রেজিস্ট্রেশন করার পদ্ধিতি,কোন কোন দলিল রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক, বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রিযোগ্য দলিলের রেজিস্ট্রেশন না করার ফলাফল ইত্যাদি এবং ADR এর বিভিন্ন পদ্ধিতিসমূহ (মধ্যস্হতা, সালিশ, আলোচনা) and প্রচলিত আইনে (cpc, crpc, Artha rin adalat etc) এডিআর এর বিধানসমূহ ও লিগ্যাল এইড আইনের ক্ষেত্রে জাতীয় লিগ্যাল এইড কমিটি, জেলা কমিটি, ইউনিয়ন কমিটির গঠন, কার্যাবলী, দায়িত্ব ইত্যাদি। এটা ছাড়াও চুক্তি আইন হতে চুক্তি, চুক্তির প্রকারভেদ অঙ্গীকারনামা, কে চুক্তি করতে পারে, চুক্তির অনুমোদন, চুক্তিভঙ্গের ফলাফল, agency, principal বিষয়গুলোর উপর নজর দিন। পরিবেশ আইন, বাড়ীভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রক কে হতে পারেন, তার দায়িত্ব, কার্যাবলী, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের বিচার পদ্ধিতি সম্পর্কে ধারনা সুস্পষ্ট রাখুন। ব্যক্তিগত আইন (মুসলিম আইন ও হিন্দু আইন) হতে বিবাহ, বহুবিবাহ, তালাক, উওরাধিকার, মোহরানা, ভরণ-পোষন, পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ হতে পারিবারিক আদালতের গঠন, কোন কোন বিষয় এই আদালতের বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে , বিচার পদ্ধিতি, ডিক্রিকৃত টাকা আদায়ের পদ্ধিতি এবং পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তালাকের পদ্ধিতি, বহুবিবাহ এবং গার্ডিয়ান এ্যান্ড ওয়ার্ড আইনের অধীনে নাবালকের শরীর ও সম্পওির অভিভাবক নিযুক্তি এবং নাবালকের সম্পওি বিক্রয় করার পদ্ধতি এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

ইহা ছাড়াও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের কিছু বিখ্যাত মতবাদ, রায়, আইনের কমন ম্যাক্সিমগুলো, প্রচলিত আইনগুলোর সর্বশেষ সংশোধনী সম্পর্কে আপনাকে আপ-টু-ডেট জ্ঞান রাখতে হবে। পাশাপাশি যারা আইনজীবী হিসেবে বা আইনজীবীর সনদ পেয়েও আদালতের বারান্দায় কোনোদিন যান নাই, তাদের ক্ষেত্রে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আদালতের দৈনন্দিন কার্যাবলীর একটা ধারণা নেওয়ার জন্য আদালত পরিদর্শন করে নিলে ভাইভায় খুব কাজে লাগবে বলে আমি মনে করি। আবার, সাধারণ জ্ঞান এর জন্য অতিরিক্ত সময় না দিয়ে নিজ জেলা, জেলার বিখ্যাত স্থান, ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর উপর সর্বশেষ কিছু তথ্য সংগ্রহে রাখার চেষ্টা করুন। এক্ষেএে আপনি নিয়মিত জাতীয় পত্রিকা পড়ার অভ্যাস করুন। জাতীয় প্রধান দৈনিকগুলোর বিনোদন পাতায় সারাসময় আঁকড়ে বসে না থেকে স্বদেশ, আন্তর্জাতিক ও সারাবিশ্ব পাতায়, বিবিসি নিউজ, বিটিভির শিরোনামগুলোয় একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।

যারা আগে ভাইভা দিয়েছেন, উনাদের সাথে কথা বলুন, কী কী টাইপের প্রশ্ন করা হয়, সেই সম্পর্কে একটা আইডিয়া নিন। আর ড্রেস কোড এর ক্ষেত্রে ছেলেরা সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, কালো কোর্ট, টাই এবং মেয়েরা শাড়ী পড়াই উওম। সর্বোপরি, ভাইভা বোর্ডে সবাই সকল প্রশ্নের উওর দিতে পারবে, এমনটা নয়। দু-একটা প্রশ্নের উওর দিতে পারছেন না বলেই আপনার ভাইভা খারাপ হচ্ছে এমন ভাবারও কোন কারণ নেই। মনে রাখবেন, আত্মবিশ্বাসই হতে পারে আপনার সফলতার সিঁড়ি। আত্মবিশ্বাসেরর সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করে বিজয়ী হন। সবার জন্য শুভকামনা।

লেখক : পবন চন্দ্র বর্মণ, সহকারী জজ, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, গাইবান্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

Skip to toolbar