
নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম (এস আলম) মাসুদের একজন গৃহকর্মীর নামেই মিলেছে কোটি টাকা। এই গৃহকর্মীর নাম মর্জিনা আকতার। তিনি চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত এই ব্যবসায়ীর বাসায় কাজ করতেন। মর্জিনা আকতারের নামেই ব্যাংকে এক কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের সন্ধান পেয়েছেন কর কর্মকর্তারা।
আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল-১৫–এর একটি অনুসন্ধানী দল এস আলম পরিবারের কর ফাঁকির বিষয়টি তদন্ত করছে। সে তদন্ত চালাতে গিয়ে মর্জিনা আকতারের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে এ অর্থ পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, দুই ব্যাংকে তাঁর নামে অর্থ আছে মোট ২ কোটি ৮৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা করে মোট ২২টি ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) রয়েছে। সব মিলিয়ে এফডিআরের অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ১০ হাজার টাকা। আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে রাখা আছে ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
নথি ঘেঁটে জানা যায়, গৃহকর্মী মর্জিনার নামে চট্টগ্রামের দুটি ব্যাংকে দুটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে খোলা একটি অ্যাকাউন্টে ২২টি এফডিআরের তথ্য রয়েছে। চট্টগ্রামের ইসলামী ব্যাংক পাঁচলাইশ শাখায় মর্জিনা আক্তারের নামে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা করে ২২টি এফডিআরের মোট টাকার পরিমাণ মোট ১ কোটি ১০ হাজার টাকা। এ ছাড়া মর্জিনা আক্তারের নামে চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব রয়েছে।

এ হিসাবে তাঁর রয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এ গৃহকর্মীর দুটি ব্যাংকে মোট ২ কোটি ৮৪ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা রয়েছে। দুটি অ্যাকাউন্টের এত পরিমাণ অর্থ জমা থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক বলছে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
এসব বিষয়ে কথা বলতে মর্জিনা আক্তারের ব্যাংক হিসাবে দেওয়া মোবাইল নম্বরে কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে কল করা হলে তাঁর স্বামী সাদ্দাম হোসেন ফোন ধরেন। তাঁর দাবি, এস আলমের মালিকানাধীন একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মর্জিনা অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করেন। তাঁর নামে দুটি ব্যাংকে থাকা টাকা ইসলামী ব্যাংকের জাকাত ফান্ডের ও তাঁদের সঞ্চয় করা অর্থ।

কর অঞ্চল-১৫–এর কমিশনার আহসান হাবিব প্রথম আলোকে বলেন, কর ফাঁকিবাজদের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কর অঞ্চল-১৫–এ থাকা এস আলম পরিবারের সদস্য ও তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। এ অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে মর্জিনা আকতারের অর্থের সন্ধান মিলেছে, যা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। তাঁর সরকারের আমলে যেসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে, তাদের অন্যতম এস আলম গ্রুপ। গত এক দশকে সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এর পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক প্রশ্রয়।

আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কর অঞ্চল-১৫ থেকে দেশের সব বাণিজ্যিক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর, ডাক বিভাগে থাকা এস আলম পরিবারের সদস্য (এস আলম, তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীন, মা চেমন আরা, ভাই আবদুল্লাহ হাসান ও তাঁদের ছেলেমেয়ে) এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, কমার্স ব্যাংক, আল–আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ইতিমধ্যে তথ্য পেয়েছেন কর কর্মকর্তারা।
এর মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছাড়া বাকি পাঁটটি ব্যাংকই এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই ছয় ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, এস আলম পরিবারের সদস্য ও তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকে জমা আছে (স্থিতি) ২৫ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবার এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নামে ওই সব ব্যাংকে থাকা হিসাবে গত পাঁচ বছরে ঢুকেছে (ডিপোজিট হয়েছে) প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। এর সিংহ ভাগই ঋণের অর্থ। এ ছাড়া আবদুল্লাহ হাসানের ব্যাংক হিসাবে নগদ জমা আছে ১ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে সে অর্থ লোপাট ও বিদেশে পাচার করার অভিযোগ আছে। জানা গেছে, এস আলম গ্রুপের নামে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ঋণ আছে।
আয়কর নিয়ে তদন্তের পাশাপাশি ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে এস আলম গোষ্ঠীর ১৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে চট্টগ্রামের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট। চলতি মাসেই নিরীক্ষা দল এর প্রাথমিক প্রতিবেদন দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।











