
অনলাইন ডেস্ক: পাঁচ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে গত কয়েক দিন ধরেই নানা ধরনের আলোচনা চলছে।
শেখ হাসিনা ভারত ছেড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে চলে গেছেন বলে গণমাধ্যমে খবর আসলেও, এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য কেউ দিতে পারেনি। বিষয়টি নিয়ে সোমবার অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, শেখ হাসিনার অবস্থান সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হতে পারিনি।
তবে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দুই মাস আগে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যাওয়া ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনও সেখানেই অবস্থান করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে চলে গেছেন, এমন খবরকে ভিত্তিহীন বলেছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তারা।
ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে বিবিসি নিশ্চিত হয়েছে, শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে যেভাবে ছিলেন, এই সপ্তাহেও ঠিক একইভাবে আছেন। দিল্লির কর্মকর্তারা বলেছেন, শেখ হাসিনা এই মুহূর্তে ভারতের সম্মানিত অতিথি। তিনি যদি পরে তৃতীয় কোনো দেশে যানও, সেটি নিয়ে আমাদের লুকোছাপা করার তো কোনো কারণ নেই!
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলেও, প্রায় ১৬ বছর ধরে দেশে ক্ষমতার দাপট দেখানো দলটির বহু শীর্ষ নেতাই এখন লাপাত্তা। তাদের অবস্থান সম্পর্কে নানা ধরনের তথ্য গণমাধ্যমসহ নেট দুনিয়ায় চর্চার বিষয় হলেও, তাদের অবস্থানের সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
কিছুদিন আগেই একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে কলকাতার রাজারহাটের নিউটাউনের অবকাশকেন্দ্র ইকো পার্কে দেখা গেছে। তার সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা অসীম কুমার উকিলসহ আরও কয়েকজনকে।
ইকো পার্কে বসেই আড্ডা দিচ্ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ সময় তার মুখে দাড়ি দেখা গেছে। ফলে হুট করে দেখে চেনা কষ্টকর। পার্কে তার আড্ডা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কিছু বাংলাদেশি জড়ো হওয়ায় দ্রুতই সটকে পরেন চার দফা অভিযানেও খুঁজে না পাওয়া আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা।
বিভিন্ন সংবাদ ও গণমাধ্যমে আসা বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পাঁচ আগস্ট মধ্যরাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যশোরের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপদ স্থানে নেয়া হয়। পরদিন তিনি বিশেষ প্রহরায় সীমান্ত অতিক্রম করেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন, তা নিয়ে কোনো তথ্য নেই।
ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানকালে অন্যতম আলোচিত নাম ছিলেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। তাকে আটকের খবর একবার চাউর হলেও, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল কেউ এর সত্যতা নিশ্চিত করেননি। এরপরই নেট দুনিয়ায় তুমুল চর্চা- কোথায় আছেন উড়ে এসে জুড়ে বসা এই ব্যক্তি?
গেলো ৩০ আগস্ট গুলশান সোসাইটির নির্বাহী কমিটির সদস্য আরাফাত আশওয়াদ ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, আরাফাতকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কাজে ঢাকা মহানগর উত্তরের গোয়েন্দা পুলিশের দুই-তিনজন কর্মকর্তা সহায়তা করছেন।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অন্যতম আলোচিত চরিত্রের নাম ডক্টর হাছান মাহমুদ। হাসিনার কৃপা পেতে তার একমাত্র কাজই ছিলো বিএনপির সমালোচনা করা এবং দলটি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা। এক সময় শোনা গেলো, হাছান মাহমুদকে বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয়েছে।
তবে এই খবরের সত্যতা মেলেনি। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে আসা এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ড. হাছান মাহমুদ সপরিবারে বেলজিয়ামে আছেন। তিনি একমাত্র ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে দেশটির লিমবুর্গ প্রদেশের হ্যাসেল্ট সিটিতে তার নিজের বাড়িতেই আছেন। সেখান থেকে ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যোগাযোগও রাখছেন।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাবেক মন্ত্রী-এমপিসহ রাজনীতিকদের মধ্যে যারা ভারতে যেতে সক্ষম হয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং নারায়ণগঞ্জের আলোচিত এমপি শামীম ওসমান ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া।
গণমাধ্যমে আসা এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শামীম ওসমান আছেন দিল্লিতে এবং নওফেল ও বিপ্লব পশ্চিমবঙ্গে বারাসাত এলাকায় অবস্থান করছেন। দালালদের সহায়তায় ৮ সেপ্টেম্বর নওফেল ও বিপ্লব বড়ুয়া ভারতে পৌঁছান। পরে তারা বারাসাত এলাকায় ভারতীয় নাগরিক জনৈক জুয়েলের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন।
কোথায় আছেন ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস? জানা গেছে, ‘দাম্ভিক’ হিসাবে খ্যাতি পাওয়া এই নেতা শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলন চলার মধ্যেই গত তিন আগস্ট ভোরে অনেকটা গোপনে দেশ ছাড়েন। ওই দিন রাতে শেখ তাপস সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম দেশ ছেড়ে যাননি। নিরাপদ স্থানেই অবস্থান নিয়েছেন। জনসমাগম বা সাধারণের সামনে আসছেন না। এড়িয়ে চলছেন সবাইকে, লোকচক্ষুর আড়ালে আছেন তিনি। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়েও আসছেন না মেয়র আতিকুল।
গত পাঁচ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি গ্রেপ্তার হলেও চাঁদপুরের আরেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, মায়া দেশেই কোথাও পালিয়ে আছেন। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য কারো কাছে নেই।
৩০ সেপ্টেম্বর দিবাগত রা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঝালকাঠি-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আমির হোসেন আমু রাজধানী বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় অবস্থান করছেন সন্দেহে সেটি ঘিরে রেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরে ভবনটির ভেতরে ঢুকে কাউকে খুঁজে পায়নি তারা।
১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার হতে শুরু করে, আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এরপরই মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সীমান্ত তল্লাশি চলালেও, নানককে পায়নি পুলিশ।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম সীমান্ত পাড়ি দিয়েছেন। দেশ ত্যাগ করেছেন সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ।
সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালও আন্দোলনের সময় স্বপরিবার সিঙ্গাপুরে চলে যান। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ভারতে পালিয়ে গেছেন স্বপরিবারে। আর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলামও ভারতে আছেন বলে জানা গেছে।
এছাড়া সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, কুমিল্লা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার ও তার মেয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র তাহসিন বাহার এবং ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীও দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের প্রায় দুই মাস পরও আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যে অনেকেই দেশ ছেড়ে গেছেন। পালাতে গিয়ে সীমান্তে ধরাও পড়েছেন কেউ কেউ। সীমান্ত পার হতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
খবরটি পড়েছেনঃ 263










